ধুলো ধূসর ইট পাথরের শহর ঢাকা। যান্ত্রিক জীবন আর নাগরিক কোলাহলের মাঝে একমুঠো প্রাকৃতিক স্পন্দন ধানমন্ডি লেক। সারি সারি গাছ, দীর্ঘ লেক, আকা-বাঁকা রাস্তা, পাখির কলরব, নৌকা, বসার জন্য পানির উপর ভাসমান ছাউনি -এ যেন ক্লান্ত শহরে শান্তির নীড়।
কাওরান বাজার নদীর একটি পরিত্যক্ত খাল থেকে আজকের ধানমন্ডি লেক। এ খালটি ঢাকার তুরাগ নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে ২৪০.৭৪ হেক্টর জমিতে ধানমন্ডি লেকের আশপাশের এলাকাকে আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এই উন্নয়ন প্রকল্পে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১৬ শতাংশ জায়গা লেকের জন্য রাখা হয়।

লেকের পাড় দিয়ে আছে ভাসমান ছাউনি। বন্ধুদের আড্ডা বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুড়তে আসা মানুষদের উপস্থিতি ছাউনিগুলো থাকে মুখরিত। এছাড়া এসব ছাউনিতে জন্মদিন, বন্ধুদের বিশেষ উৎসবও হয়ে থাকে।
ধানমন্ডি লেকের বর্তমান দৈর্ঘ্য ৩ কি.মি, প্রস্থ ৩৫ থেকে ১০০ মিটার, গভীরতা ৪.৭৭ মিটার, জলাশয়ের মোট আয়োতন ৩৭. ৩৭ হেক্টর। লেকটি ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়ক থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কে এসে শেষ হয়েছে।

ধানমন্ডি লেকের উপর দিয়ে দেখা মিলবে ছোট বড় পায়ে হাঁটা ব্রীজ। ব্রীজগুলোতে ছোট বড় আড্ডা জমে ওঠে। এখান থেকে দীর্ঘ লেকের দেখা মেলে বলে ঘুরতে আসা মানুষ ছবি তোলার জন্য এ জায়গাগুলোই বেছে নেয়। লেকের পানিতে ব্রীজের প্রতিচ্ছবি সুন্দর দৃশ্যের তৈরি করে।

ধানমন্ডি লেকের যে অংশটুকু ৩২ নাম্বার নামে পরিচিতি পেয়েছে তার সঙ্গে রবীন্দ্র সরোবরের যোগসূত্র তৈরি করেছে ৮ নাম্বারের ঝুলন্ত ব্রীজ। ঝুলন্ত ব্রীজটি ধানমন্ডি ৮ নাম্বার রোডের উপর দিয়ে অর্ধ চন্দ্র আকৃতিতে রবীন্দ্র সরোবরে গিয়ে মিসেছে। রাত বা দিনে ব্রীজটির সৌন্দয্য যেন একই রকম। প্রায় সব সময়ই ব্রীজটির উপরে আড্ডা দিতে দেখা যায়। নিচ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, উপরে ছাউনি হয়ে আছে বিহৎ বৃক্ষ। আশপাশের গাছগুলো হেলে পড়েছে ব্রীজের ওপর। নিজ চোখে না দেখলে এর সৌন্দয্য বর্ণনা করা সহজ নয় …

লেকের বিভিন্ন জায়গাতে দেখা মিলবে সাঁতরে বেড়ানো হাঁস। দলে দলে হাঁসগুলো এদিক ওদিক ছুটে চলে। শহরের যান্ত্রিক জীবনে কল্পনায় হারাতে পারেন গ্রামের স্মৃতিতে। দেখা মিলবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক, লতাপাতা, পানিতে জন্ম নেয়া অনেক উদ্ভিদ।

আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অনেকেই লেকে আসেন খেলাধুলার জন্য। খেলাধুলার জন্য রয়েছে আলাদা জায়গা। লেকের কয়েকটি জায়গায় ক্রিকেট, ফুটবল, বেডমিনটন খেলতে দেখা যায়। ক্রিকেট, ফুটবলের জন্য জায়গাগুলো তুলনামূলক ছোট হলেও শহরে এতটুকু জায়গা পাওয়াটাও কম কিসে?

লেক পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শতবর্ষী গাছের দেখা মিলবে। ক্লান্ত হলে একটু বসে যেতে পারেন। কয়েকবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিতে পারেন, এতে আপনার অশান্ত মন কিছুটা হলেও শান্ত হবে। এছাড়া বয়স্ক গাছের নিচে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন একজন ভিন্ন মানুষ হিসেবে। লেকের অন্য জায়গাগুলোর তুলনায় এ জায়াগাগুলো কিছুটা নিরবও থাকে। চাইলে একাকিত্ব কিছুটা সময় কাটিয়ে যেতে পারেন।

লেকজুড়ে দেখা মিলবে হরেক প্রজাতির গাছ। ধারণা করা হয় প্রায় ১০০ এর বেশি প্রজাতির গাছ আছে ধানমন্ডি লেকে। তবে কৃষ্ণচূড়া, বট, রেইন্ট্রি, আম, কাঁঠাল, নিম, বকুল, কদম গাছের দেখা মিলবে যেখানে সেখানে। এছাড়া দেশি-বিদেশি গাছের এক বিশাল জগৎ ধানমন্ডি লেক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িও ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। যদিও এটি এখন যাদুঘর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। লেকের ভেতর থেকেই দেখা মিলবে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। তাঁর স্মৃতিতে নির্মাণ করা প্রতিকৃতির পেছনের অংশ লেকের পানিতে প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। প্রতিকৃতি’র পাশ দিয়ে লেকের পানিতে নেমে এসেছে চওড়া সিড়ি।

লেকের চারিদেকের কয়েকটি স্থানে আছে ভাসমান খোলা জায়গা। ভাসমান জায়গাগুলো থেকে আপনার মনে হবে লেকের মাঝখানে অবস্থান করছেন। পানি আর গাছের মেলবন্ধনের দেখা মিলবে এ জায়গা থেকে। একটা বিকেল এখানে কাটিয়ে দিতে আপনার খারাপ লাগবে না।

লেকে কয়েকটি দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপগুলো ব্রীজের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আছে। এখানে ছাউনিসহ ব্রীজের পাশাপাশি আছে ছাউনি ছাড়া ব্রীজও। দ্বীপগুলোতে দিন-রাত সব সময়ই মানুষের উপস্থিতি থাকে। তবে কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত লেকে অবস্থান করা যাবে। বাস্তব চিত্র আলাদা, রাত ১০টার পরও লেকে অনেকেই অবস্থান করে থাকে।

জিয়া চত্বর, মেডিনোভা চত্বর, স্যুটিং পয়েন্ট, দ্বীপ চত্বর, লেক ভিউ সাইড, রবীন্দ্র সরোবর, ডিঙ্গি বোড ক্লাব, সুরধনী চত্বর, ব্যাচেলর পয়েন্ট, শতায়ু অঙ্গন, লেকপাড় গোল চত্বর, বঙ্গবন্ধু চত্বর, শেখ রাসেল চত্বর, শিকার দ্বীপ, আম্রাকানন, বটতলা পয়েন্ট নামে লেকের বিভিন্ন জয়াগার নামকরন করা হয়েছে।

ভর দুপুরে গাছের ছায়ায় ক্লান্ত প্রথিকের গভীর ঘুমের দৃশ্যে চোখ আটকে যেতে পারে। ব্যস্ত শহরে ঘুরতে ঘুরতে দূর দুরান্তের অনেকেই একটু বিশ্রাম নেন লেকের বসার জায়গাগুলোতে।

খাবারের জন্য লেক ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি রেস্তোঁরা। ডিঙ্গি, পানশী, ডাইনামিক ফুড কোর্ড, সাম্পান, বজরা অন্যতম। এছাড়া ছোট ছোট বেশ কয়েকটি রেস্তোঁরা আছে লেক পাড়ে। এগুলোয় খাবারের দাম কিছুটা বেশি হলেও নিরাপদ। এছাড়া লেক পাড়ে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট ফুড কোর্ড, এগুলোতেও পরিবার, বন্ধুদের নিয়ে একবেলা খেয়ে নিতে পারেন।

রবীন্দ্র সরোবর ধানমন্ডি লেকের প্রাণ কেন্দ্র বলেই ধরা হয়। এখানে বিভিন্ন দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এটাকে উন্মক্ত মঞ্চও বলা হয়ে থাকে। নাটক, কবিতা, গানে মতে ওঠে এ মঞ্চ। এছাড়া প্রতি সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সরোবরে গিটার, বাঁশিতে মেতে ওঠে ছেলে-মেয়েদের আড্ডা। শিক্ষার্থী, কবি, শিল্পী, নানা বয়সের মানুষ বিকেল থেকে জায়গাটিতে ভীড় করতে থাকে। হকরদের আনাগোনা বেড়ে যায়, ফুসকা, চটপটি, সিঙ্গারা, পুরি, ঝাল মুড়ি, চিড়া ভাজা, বাদাম, ধোয়া ওড়ানো চা-কফি, সিগেরেটে আড্ডা চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। রাত আরও গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভীড়ও কমতে থাকে। সবাই গন্তব্যে ফেরে আরও একটি দিনের আশায় …