বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচনে একটি বিষয় প্রায় একইভাবে চোখে পড়ে- হলফনামায় প্রার্থীদের সম্পদের অঙ্ক অবিশ্বাস্য রকম কম।
কিন্তু বাস্তবতা? তারা দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্যতম। তাহলে প্রশ্ন ওঠে- এই বিপুল বৈষম্য আসে কোথা থেকে?
কালো টাকা ও অপ্রকাশ্য সম্পদের সংস্কৃতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো- বড় অংশের সম্পদই হলফনামার বাইরে থাকে। বেনামি ফ্ল্যাট, আত্মীয়ের নামে জমি, অফশোর একাউন্ট, ব্যবসায় অংশীদারিত্ব -এই সবই কাগজে ধরা পড়ে না। ‘বেনামি’ ব্যবস্থার আইনি ফাঁকফোকর থাকে। আইনে সরাসরি নিজের নাম না থাকলে হলফনামায় তা দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই। এই ফাঁকটাই সম্পদ গোপনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাই প্রার্থীরাও সম্পদের ভুল তথ্য দিতেও ভয় করেন না।
হলফনামা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নির্বাচন কমিশন হলফনামা নেয়, কিন্তু যাচাই করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা দুটোরই ঘাটতি আছে। প্রার্থীরা যেহেতু জানেন হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পত্তির হিসাব যাচাই-বাছাই করা হবে না, তাই তারাও অসত্য তথ্য দিতে উৎসাহিত হন। এছাড়া কেউ মিথ্যা তথ্য দিলেও শাস্তির নজির নেই বললেই চলে।
কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপন একে অপরের পরিপূরক
যে সম্পদ হলফনামায় কম দেখানো হয়, সেটাই কর নথিতেও কম দেখানো হয়। ফলে পুরো অর্থনীতি চলে ছায়া ব্যবস্থায়। ক্ষমতায় গেলে সম্পদের হিসাব আরও অস্বচ্ছ হয়ে পড়ে। নির্বাচনের আগে ‘দরিদ্র’, ক্ষমতায় গিয়ে হঠাৎ ‘কোটিপতি’-এই রূপান্তরের ব্যাখ্যা আজও রাষ্ট্র দিতে পারেনি।
রাজনীতিতে ঢুকতে বিপুল অঘোষিত অর্থের প্রয়োজন হয়। নির্বাচন করতে কোটি কোটি টাকা লাগে। কিন্তু সেই টাকার উৎস কাগজে দেখানোর জায়গা নেই। ফলে ঘোষিত সম্পদ কম রাখাই রাজনৈতিক রীতি। হলফনামা জনস্বার্থের দলিল নয়, আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বর্তমানে হলফনামা এমন একটি কাগজে পরিণত হয়েছে, যা আইনি প্রয়োজন মেটায়, বাস্তবতা নয়।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা। দুদক বা অন্যান্য সংস্থা হলফনামার তথ্য নিয়ে গভীর তদন্তে যায় না, ফলে কেউ ভয়ও পায় না। সমাজও মিথ্যাকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে। ভোটাররা জানে সম্পদ লুকানো হচ্ছে, তবুও প্রশ্ন করে না। কারণ মানুষ মনে করে, ‘সবাই-ই এমন।’ শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ না থাকায় মিথ্যাই লাভজনক। আইনে মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান থাকলেও বাস্তবে সেটা প্রয়োগের নজির বিরল।