রাজবাড়ী জেলার সদর পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, সেচ্ছাচারিতা ও হুমকি-ধামকি দিয়ে ভয় প্রদর্শনের অভিযোগ এনেছে পৌরসভার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদাররা। একই সঙ্গে মেয়রের হাত থেকে রাজবাড়ী পৌরসভাকে ‘রক্ষা করে সচল’ করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তারা।
একাধিক ঠিকাদার জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের তিন-চার বছর পার হলেও পরিশোধ করা হচ্ছে না চূড়ান্ত বিল ও জামানতের টাকা। এছাড়া, আইন লঙ্ঘন ও কার্যাদেশ প্রত্যাহার করে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে দেওয়া এবং বারবার আবেদন করা হলেও লাইসেন্স নবায়ন করে দিচ্ছে না।
রাজবাড়ী পৌরসভার তত্ত্বাবধায়নে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাসেল ট্রেডার্স এর স্বত্ত্বাধিকারী মো. মানিক সরদার ও তার ওয়ার্ক পাটনার লিটন সাহা জানান, পৌরসভার কয়েকটি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করেছি প্রায় ৪ বছর। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো প্রথম পর্যায়ে ২টি প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল এবং রাজবাড়ী পৌরসভার জেনারেল ফান্ডের ২টি প্রকল্পের একটি জামানতের টাকা ও আরেকটি প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করার পর আমাদের অজ্ঞাত রেখে কোনো নোটিশ না দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান আজিম ট্রেডার্সকে কাজ কারার অনুমতি দেন। এ বিষয়ে একাধিকবার মেয়র মহোদয় ও নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সমাধান ও ঠিকাদারী আইন লঙ্ঘন করার কারণ লিখিতভাবে জানতে চাইলেও পৌর কর্তৃপক্ষ তার কোনো কারণ মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে জানায়নি।
মানিক সরদার জানান, আরসিসিএল-জেভি এর লাইসেন্সে রাজবাড়ী পৌরসভার তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট মিউনিসিপল (বিএমডিএফ) কাজের ১০% জামানত, ১০% চূড়ান্ত বিল টাকা ও ডব্লিউ বি এম এর হিসাব দিচ্ছেন না। আমার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করে দিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় নতুন করে আবেদন করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) এর দপ্তর ও মেয়র মহোদয়ের দপ্তরে আবেদন জমা রাখছেন না।
মানিক সরদার আরও বলেন, এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মাদ আলী খান এর নিকট মৌখিকভাবে জিজ্ঞাসা করলে তিনি অশালীন আচরণ করছেন। এছাড়া ব্যবসায়ী শালিসনামার জন্য মেয়র মহোদয় বরাবর আবেদন করছি প্রায় দেড় বছর হতে চলল। ব্যক্তিগত মোহাম্মাদ আলী চৌধুরীর কারণে রাজবাড়ী পৌরসভার মেয়র মহোদয় মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী আমার কাজের চূড়ান্ত বিল, জামানত, ৮০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত করার পর আমাকে অজ্ঞাত রেখে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে দেওয়ার অনুমতি দেন, লাইসেন্স নবায়ন, আবেদন ও শালিসনামার কোনো ব্যবস্থাই করছেন না।
এর আগে, এম.এইচ.এন্ড ডিসিএল -এর স্বত্বাধিকারী মো. ঢালী রাজবাড়ী পৌরসভায় একটি প্রকল্পের চুক্তিনামা করতে এলে মেয়রের অফিস কক্ষে তাকে জীবননাশের হুমকি দেয়া ও তার গাড়ি চালককে লাঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে এ ঘটনায় তৎকালীন রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার সালমা বেগমের সহায়তায় পৌরসভার সঙ্গে চুক্তিনামা সম্পাদন হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় পত্রিকায় বিভিন্ন শিরোনামে খবর প্রকাশ হয়।

এছাড়া, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্স -এর চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ গত চার বছর ধরে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
লিটন সাহা বলেন, রাসেল ট্রেডার্স এর আবেদনের প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে এলজিইডি প্রকল্প পরিচালক প্রধান প্রকৌশলী ও স্থানীয় সরকার বিভাগ, স্থানীয় সরকার পল্লি ও সমবায় মন্ত্রনালয় এর সচিব বরবর আবেদন করা হলে প্রকল্প পরিচালক বিষয়টি সরোজমিনে তদন্তের জন্য দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল রাজবাড়ী সদর পৌরসভায় পাঠান।
প্রতিনিধি দল রাজবাড়ী পৌরসভার হয়ে রাজবাড়ী পৌরসভা উপ সহকারী প্রকৌশলী সিভিল মোশারফ আহম্মেদ আক্রাকার ও আঃ সোবহানকে নিয়ে প্রকল্প পরিদর্শন করে এবং অন্যান্য অভিযোগগুলো তদারকি করেন।
পরবর্তীতে প্রকল্প পরিচালক মেয়র বারাবর প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল ও জামানতের টাকা পরিশোধ করতে চিঠি পাঠান। কিন্তু বিল ও জমানতের টাকা পরিশোধ না করায় পাঁচ কর্মদিবস সময় বেঁধে দিয়ে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করতে মেয়র বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এতেও বিল পরিশোধ না করায় আবারও পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করার কাথা জানিয়ে চিঠি দেন প্রকল্প পরিচালক। তা স্বত্তেও ব্যক্তিগত মো. আলী চৌধুরীর কারণে মেয়র মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ পরিশোধ করেননি।
এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী খান বলেন, ‘লাইসেন্স নবায়ন করে দিচ্ছি না’ -ঠিকাদারের এ অভিযোগ সত্য নয়। আমরা নতুন লাইসেন্স ও লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে উৎসাহিত করি। তবে রাসেল ট্রের্ডাস পৌরসভার কাছে কিছু টাকা পাবে। কিন্তু উনি (মানিক সরদার) কখনো টাকা নিতে আসে না। তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করার অভিযোগও সত্য নয়। পৌরসভার সঙ্গে তার যে লেনদেন আছে তা পৌরসভায় এসেই সমাধান করতে হবে। এছাড়া কিছু কাজ আছে যা তিনি করেননি কিন্তু টাকা দাবি করছেন, সেটাও দেয়া সম্ভব না।
সহকারী প্রকৌশলী আরও বলেন, রাসেল ট্রেডার্স এর একটি কাজ করার নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে গেলেও কাজ না করায় তাকে নোটিশ করা হয়। নোটিশের উত্তর না পেয়ে আজিম ট্রেডার্সকে কাজ কারার অনুমতি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মানিক সরদার বলেন, আইন অনুযায়ী আমাকে তিনবার নোটিশ করতে হবে কিন্তু একবারও আমাকে নোটিশ করা হয়নি। আমার লাইসেন্স নবায়ন করার চিঠি দিলে আমি মেয়র মহোদয় বরাবর আবেদন করব কেন? আমি পৌরসভায় নিজে বিলের জন্য গিয়েছি, পৌরসভার অফিসের সিসি ফুটেজ দেখলে প্রমাণ মিলবে।
তিনি বলেন, মেয়র মহোদয় ও নির্বাহী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মাদ আলী খান সরেজমিনে সাইড পরিদর্শন করতে এসে বলেন বাকী কাজটুকু বিগডেন করতে হবে। তার মৌখিক অর্ডারে বিগডেনে আমি তিন দিন কাজ করার পর আংশিক বিলও প্রদান করেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হক ট্রেডার্স -এর স্বত্বাধিকারী মো. শহিদুল হক বলেন, পৌরসভার কাছে অনেকগুলো টাকা পেতাম, এখন অল্প অল্প করে নিয়ে পাওনা টাকা কমিয়ে এনেছি। এ বিষয়ে অভিযোগ করতে চাই না, স্থানীয় ব্যবসায়ী আমরা, মেয়র সাহেবদের মতো মানুষদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই না, আমাদেরতো এখানেই থাকতে হয়।
প্রকল্প উপ-প্রকৌশলী আব্দুল বাতেন বলেন, ঠিকাদারের অভিযোগের ভিত্তিতে আমারা গত ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে প্রকল্পের কাজ সরোজমিনে পরিদর্শন করতে যাই। ঠিকাদার বিগডেন করার যে দাবি করেছেন তার সত্যতা পাওয়ায় সে অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন দেই।
তিনি বলেন, প্রকল্প শেষ হয়ে গেলেও রাজবাড়ী সদর পৌরসভার এ ঝামেলাটা রয়েই গেছে। আমার মনে হয় এটা ঠিকাদার ও মেয়রের স্থানীয় বিরোধ। তবে ঠিকাদারের একটা ভুল হয়েছে। তিনি ‘ওয়ার্ক পারমিট’ ছাড়া মেয়রের মৌখিক কথায় আরসিসি ডেনের কিছু অংশ বিগডেন করেছে।

প্রকল্প পরিচালক (গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো প্রথম পর্যায়) প্রভাষ চন্দ্র বলেন, যে প্রকল্পটির কথা হচ্ছে এটা আজ থেকে কয়েক বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। আমারা প্রকল্পের সব অর্থ পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করেছি। ঠিকাদারকে টাকা না দেওয়ার বিষয়ে এর আগে অভিযোগ পেয়ে আমরা প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম। প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ঠিকাদারের চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ পরিশোধ করার জন্য চিঠি পাঠাই। মেয়র সাহেব অর্থ পরিশোধ না করলে আমরা আবারও পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ঠিকাদারের টাকা পরিশোধ করতে চিঠি দেই। এরপর মেয়র এ বিষয়ে একটি চিঠির জাবাব দেন। এতে বলা হয়েছে ঠিকাদার যে অংশ কাজ করেছে সে অংশটুকুর পাওনা অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
এছাড়া আমরা ঠিকাদারের আপত্তি মিমাংশার জন্য মেয়র ও ঠিকাদারকে ঢাকায় ডেকেছিলাম। মেয়র তার প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, ঠিকাদারও এসেছিলেন কিন্তু দুজন একই সময়ে না আসায় মিমাংসা করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে পৌর মেয়র মোহাম্মদ আলী চৌধুরীকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে ফোনে কিছু বলতে পারব না। এ বিষয়ে জানতে হলে সরাসরি আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে।