মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের ফলে পুনরুজ্জীবিত হওয়া আঞ্চলিক সংঘাত এখন বড় ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের জেরে তেহরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বাহিনী লোহিত সাগরে সৌদি আরবের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। খবর আলজাজিরার।
তবে, ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকা এই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দেশটির আকাশ টানা দ্বিতীয় রাতের মতো শান্ত ছিল; আজ রোববার (২৬ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন কোনো মার্কিন হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
গত ১১ জুলাই থেকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টাকারী ট্যাঙ্কারগুলোতে আক্রমণ করার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরপর ১৩ বার ইরানের ওপর রাতভর বিমান হামলা চালিয়েছিল। বৈরিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষই জুনে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করে এবং এর ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা ভেস্তে গেছে বলে মনে করা হচ্ছিল।
তবে শুক্রবার থেকে ইরানে কোনো মার্কিন বিমান হামলা হয়নি এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এখনো কথা বলছে। এক্ষেত্রে দুপক্ষ আরও অর্থবহ আলোচনায় ফিরে আসতে পারে বলে সাময়িকভাবে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
যাই হোক, যদি আরেকটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অর্জিতও হয়, তবুও এই যুদ্ধ থেকে সৃষ্টি হওয়া শত্রুভাবাপন্ন পরিণতি অন্য যেকোনো স্থানে সংঘাত ও মুখোমুখি অবস্থান তৈরি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের হামলার ফলে অপরিশোধিত তেল ও সারের কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে; যা জ্বালানির মূল্যকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু দেশে খাদ্য নিরাপত্তায় সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
মার্চ মাসে, ইরানের ওপর হামলার জবাবে, লেবাননের তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী ইসরায়েলে পুনরায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি ধ্বংসাত্মক আক্রমণ শুরু করে যাতে ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
এখন, মার্কিন-মিত্র সৌদি আরব এবং রাজধানী সানাসহ উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হুতি আন্দোলনের মধ্যে আরেকটি ধূমায়িত আঞ্চলিক সংঘাত আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরব এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা হুতিদের বিরুদ্ধে এক নৃশংস গৃহযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, যা ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে থমকে আছে।
বিশ্বব্যাপী সংকটের ঝুঁকি
চলতি মাসে ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমান অবতরণ বন্ধ করতে চালানো হামলার পর হুতিরা সৌদি আরবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে সেই যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যায়। গত সোমবার হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে এবং শুক্রবারের শেষভাগে সৌদিরা হুতি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা শহরে বিমান হামলা চালায়।
হুতি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে জানিয়েছেন, এর জবাবে হুতি বাহিনী উপকূলীয় শহর জিজান ও ইয়ানবুতে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল জায়ান্ট আরামকোর মালিকানাধীন স্থাপনাগুলোতে রোববারের ওই হামলা চালিয়েছে।
জিজানে আরামকোর শোধনাগারের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে সম্পর্কে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি, তবে হামলার পর সেখান থেকে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলের প্রধান রপ্তানি পথ ইয়ানবুতে, তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে রিয়াদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গ্রিক সামরিক বাহিনী পরিচালিত একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়।
এই বাড়তে থাকা সংঘাত এমন আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে যে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরুদ্ধ করতে পারে, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। যদি বাব আল-মান্দেব এবং হরমুজ প্রণালি উভয়ই অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে যে সংকট তৈরি হবে তা সারা বিশ্বে চরম অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করবে।
ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ
লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি, মার্কিন-ইরান যুদ্ধটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সক্রিয় সংঘাতের সাথে জড়িয়ে পড়েছে— আর তা হলো ইউক্রেন দখলের উদ্দেশ্যে রাশিয়ার প্রচেষ্টা।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি জাহাজে দূরপাল্লার হামলায় এক বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে একজন নাবিক নিহত এবং অন্য একজন আহত হন। ইরান এই হামলার জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছে এবং এই শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাতে তেহরানে নিযুক্ত কিয়েভের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, কাস্পিয়ান সাগরে দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে কিয়েভ খুবই শক্তিশালী ফলাফল অর্জন করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব হামলায় ইরানের সামরিক কার্গো পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজ এবং একটি যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বিমান হামলা হঠাৎ বন্ধ করার কোনো কারণ জানাননি, তবে প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে ট্রাম্প সবসময়ই স্পষ্টভাবে বলেছেন তাঁর অগ্রাধিকার হলো কূটনীতি, তবে আলোচনার টেবিলে আসতে ব্যর্থ হলে কী হতে পারে, তা তিনি ইরানকে দেখিয়ে দিয়েছেন।
শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে এখনো কিছু যোগাযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে; তারা একটি চুক্তি করতে আগ্রহী।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না তারা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত… তবে আমি তাদের কথা শুনতে রাজি আছি।’