বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার ও মাদকাসক্তের সংখ্যা ভয়ঙ্করভাবে বাড়ছে। দেশে এখন মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখ। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৬ লাখ। সে হিসেবে গত সাত বছরে দেশে মাদকাসক্ত বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। মাদকাসক্তদের বেশির ভাগ পুরুষ। নারী ও শিশুদের মধ্যেও মাদকাসক্তি রয়েছে, যা বেড়েই চলেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক সমীক্ষায় মাদকাসক্ত জনসংখ্যার এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ধরনের সমীক্ষা এই প্রথম করেছে ডিএনসি। এর আগে ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট যে সমীক্ষা করেছিল, সেখানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, পারিবারিক অশান্তি, সহজলভ্যতা এবং সীমান্তে মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাই মূলত এই বৃদ্ধির বড় কারণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমীক্ষাটি শিগগিরই প্রকাশিত হবে। অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সমীক্ষায় দেশের আট বিভাগের ১৬টি জেলা থেকে ৫ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে মাদকাসক্তির হিসাব তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গবেষকেরা স্বীকৃত গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
গবেষণার ফলাফলের অংশে বলা হয়, দেশে প্রাক্কলিত মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৩ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। জনসংখ্যা ধরা হয়েছে সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা শুমারি অনুযায়ী ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার।
কেন বাড়ছে মাদকাসক্তি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘ সময় চাকরি না পাওয়া বা আর্থিক অনিশ্চয়তায় অনেক তরুণ হতাশায় ডুবে যায়। এই পরিস্থিতি থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে তারা মাদকের দিকে ঝুঁকছে। অনেক পরিবারে অভিভাবকদের অবহেলা, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা পারিবারিক কলহ তরুণদের মানসিক চাপে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারে স্নেহ-ভালোবাসা ও নজরদারির অভাব থাকে, সেসব পরিবারের সন্তানরা মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
এছাড়া বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক পাচারকারীদের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ করছে, আবার ভারত সীমান্ত দিয়ে আসছে ফেনসিডিল ও গাঁজা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই মাদক জব্দ করলেও সীমান্তে পাচার ঠেকানো পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না।
মাদকাসক্ত বাড়ার পেছনে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, মাদকাসক্ত বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা নতুন কিছুর প্রতি কৌতূহলও রয়েছে। অনেক তরুণ প্রথমে মাদক সেবন শুরু করে কৌতূহল থেকে। পরে ধীরে ধীরে তা আসক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা করা হচ্ছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গোপন লেনদেন ও ডেলিভারি হওয়ায় তরুণদের কাছে মাদক আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে।
প্রভাব ও সমাধানের উপায়
মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য ধ্বংস করছে না, সামাজিক অপরাধও বাড়াচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধের সঙ্গে মাদকাসক্তদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি মাদক সেবনের ফলে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক অস্থিরতা ও পরিবার ভাঙনের ঘটনাও দিন দিন বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এজন্য দরকার সামাজিক সচেতনতা, পরিবারভিত্তিক নজরদারি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমকে আরও জোরদার করা। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, বিনোদন ও খেলাধুলায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশে মাদকাসক্তি এখন এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সাত বছরে সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া প্রমাণ করে, কেবল অভিযান চালানো নয় প্রতিরোধ, পুনর্বাসন ও সামাজিক দায়িত্বশীলতা একসঙ্গে প্রয়োগ না করলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।