1. mistake.rocky@gmail.com : মো: সরোয়ার সরদার : মো: সরোয়ার সরদার
  2. dhakahour@gmail.com : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক
  3. sarowar.rocky@gmail.com : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি
  4. sadakmostafa5@gmail.com : Sadak Mostafa : Sadak Mostafa
  5. info@dhakahour.com : বিশেষ প্রতিনিধি : বিশেষ প্রতিনিধি
  6. yfmahmud82@gmail.com : Yousuf Mahmud : Yousuf Mahmud
ইতিহাসে লাল সন্ত্রাস ও প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশ | ঢাকা আওয়ার
রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৯:৩৯ অপরাহ্ন

ইতিহাসে লাল সন্ত্রাস ও প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশ

মো. সারোয়ার সরদার
  • রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় পাঠাগারের দেওয়ালে আঁকা শেখ মুজিব ও সিরাজ শিকদার। ছবি: সংগৃহীত

‘লাল সন্ত্রাস’ এমন একটি বিষয় যা ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এটি শুধুমাত্র একটি শব্দবন্ধ নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ধারার প্রতীক, যা সহিংসতা, দমননীতি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে লাল সন্ত্রাস একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক মিছিল, মিটিং এবং তর্ক-বিতর্কে মুখর ক্যাম্পাস যেন হয়ে উঠেছে মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই মনে করেন যে, এটি শুধু একটি আন্দোলন নয় বরং একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। অন্যদিকে, এর সমালোচকরা বলছেন, এটি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর আঘাত হানছে।

 

লাল সন্ত্রাসের ইতিহাস ও ধারণা

লাল সন্ত্রাসের (Red Terror) ধারণার সূচনা রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লবের সময়। ১৯১৮ সালে বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের দমন করার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত প্রচারণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই সময় সোভিয়েত রাশিয়ার চেকা (গুপ্ত পুলিশ) বিপুলসংখ্যক বিরোধী দল ও ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ইতিহাসে দেখা যায়, লাল সন্ত্রাস শুধু রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চীনের মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট আন্দোলনেও এটি প্রয়োগ করা হয়। ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর দমননীতি প্রয়োগের মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে লাল সন্ত্রাস।

 

বাংলাদেশে লাল সন্ত্রাস: প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশে লাল সন্ত্রাস মূলত বামপন্থী রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময় বামপন্থী দলগুলো তাদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংস আন্দোলন পরিচালনা করেছে। ১৯৭০-এর দশকে সর্বহারা পার্টি, লাল পতাকার আন্দোলন এবং সশস্ত্র বাম সংগঠনগুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এই সময় কমরেড শিরাজ শিকদার ছিলেন লাল সন্ত্রাসের অন্যতম প্রতীক। তার নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনগুলো একদিকে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়, অন্যদিকে সহিংসতা এবং দমননীতির মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও ভীতি ছড়ায়।

সম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে লাল সন্ত্রাসের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু সম্প্রতি এক বক্তব্যে জনগণের সুরক্ষায় ‘প্রতিরোধমূলক সহিংসতা’র প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘লাল সন্ত্রাসই একমাত্র পথ বা উপায়।’ তার এই মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে বামধারার ছাত্র ইউনিয়ন, তাদের আন্দোলন ও দাবির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। লাল সন্ত্রাসের সমর্থকরা একে সমাজ পরিবর্তনের অনিবার্য পথ হিসেবে তুলে ধরছে। তারা বলছে, এটি শোষিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। বিশেষত সর্বহারা আন্দোলনের ঐতিহ্য ও লাল পতাকার প্রতীকী শক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, এই প্রক্রিয়া সমালোচিতও হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, লাল সন্ত্রাস শিক্ষাঙ্গনের সহিংসতার মূল কারণ হয়ে উঠছে। কমরেড শিরাজ শিকদারের আদর্শিক অনুসরণকারী এই আন্দোলনকারীরা সহিংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে আঘাত হানছে এবং শিক্ষার পরিবেশকে ধ্বংস করছে। ফলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিল ও মিটিংগুলো এখন মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন ও সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতিতে অস্থিরতা বৃদ্ধি করছে।

ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু

লাল সন্ত্রাসের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

লাল সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সমাজের স্থিতিশীলতার উপর। আন্তর্জাতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, লাল সন্ত্রাস শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পর্যায়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব থেকে শুরু করে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। লাল সন্ত্রাসের ঐতিহাসিক এবং আদর্শিক ভিত্তি দেশের বামপন্থী রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করেছে। এর ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হচ্ছে এবং সমাজে বিভাজন বাড়ছে। ঢাকার মতো শহরগুলোতে ছাত্ররাজনীতি ও সামাজিক অস্থিরতার মূলে এই মতাদর্শিক সংঘর্ষ বড় ভূমিকা রাখছে।

লাল সন্ত্রাস প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে আসায় দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হচ্ছে। একদিকে বামপন্থী দলগুলো এর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী দলগুলো এর বিরোধিতা করছে।

লাল সন্ত্রাসের নামে সহিংসতা শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধকেও ক্ষুণ্ন করে। এই প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবক্ষয় ঘটায় এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও উদার মানসিকতার অভাব তৈরি করে।

 

সমাধানের পথ

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে লাল সন্ত্রাসের মতো ঘটনাগুলো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত উদ্যোগ। মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিংসতার সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

লাল সন্ত্রাসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বুঝতে হবে যে, সহিংসতা কখনোই টেকসই সমাধান হতে পারে না। বাংলাদেশে লাল সন্ত্রাস ঘিরে চলমান আলোচনা আমাদের সামনে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা উন্মোচন করছে। তবে এটি নির্ভর করবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র সমাজ এবং সাধারণ জনগণের উপর যে, তারা কি ভবিষ্যতে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে কিনা।

শেয়ার করুন

এই বিষয়ের আরও সংবাদ