বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্র হিসেবে ডাকসুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে ভিপি (সহসভাপতি) ও জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে আসীন অনেকেই ছাত্ররাজনীতির মাঠ পেরিয়ে জাতীয় সংসদে গেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই ধারাবাহিকতাকে অনেকে ‘ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি’র সেতুবন্ধন হিসেবেই উল্লেখ করেন।
ডাকসুর ইতিহাস ও গুরুত্ব
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৩ সালে ডাকসু কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সামাজিক নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে এই সংসদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময় পর্যন্ত ডাকসু দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে।
ডাকসু থেকে জাতীয় নেতৃত্বে
ডাকসুর ভিপি ও জিএসরা শুধু শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেননি, অনেকেই পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায় ডাকসু নেতৃত্ব কেবল ছাত্ররাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে শেখ মুজিব ডাকসু সদস্য ছিলেন। যদিও সরাসরি ভিপি বা জিএস ছিলেন না, তবে ডাকসু কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনৈতিক জীবন গড়ার অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীতে তিনি হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি।
তাজউদ্দীন আহমদ
বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি ও ডাকসুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠক হিসেবে তিনি ডাকসুর কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন, যা তাঁর নেতৃত্বগুণকে জাতীয় রাজনীতিতে এগিয়ে দেয়।
ডাকসুর ভিপি থেকে জাতীয় সংসদে
১. নুরুল হক নূর (ভিপি, ২০১৯) – সর্বশেষ নির্বাচিত ডাকসু ভিপি ছিলেন তিনি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা হিসেবে জাতীয় পরিচিতি পান। ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি নতুন রাজনৈতিক সংগঠন ‘গণঅধিকার পরিষদ’ গড়ে তুলেছেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়।
2. আমান উল্লাহ আমান (ভিপি, ১৯৮৯) – তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা হিসেবে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিএনপি থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
3. মোহাম্মদ নাসিম (জিএস, ১৯৭০-এর দশক) – আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দিয়ে তিনি একাধিকবার সাংসদ ও মন্ত্রী হন। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে যাত্রার অন্যতম উদাহরণ তিনি।
অন্যান্য ভিপি ও জিএসদের ভূমিকা
মাহমুদুর রহমান মান্না (জিএস, ১৯৮০-এর দশক) – ডাকসুর জিএস হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরবর্তীতে নাগরিক ঐক্যের নেতৃত্বে এসে জাতীয় রাজনীতিতে বিকল্প কণ্ঠস্বর হিসেবে জায়গা করে নেন।
আসাদুজ্জামান নূর (সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ডাকসু) – যদিও সরাসরি ভিপি বা জিএস ছিলেন না, কিন্তু ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে আসেন। আওয়ামী লীগ থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী হন।
অধ্যাপক আব্দুল মান্নান (ভিপি, ১৯৭০-এর দশক) – তিনি পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য হন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকেন।
ডাকসুর ভিপি-জিএসরা কেন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ?
১. রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্র – ডাকসুর নির্বাচনে প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর ভোটে নির্বাচিত হন, যা তাদেরকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা দেয়।
২. জনসম্পৃক্ততা – ডাকসুর নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আন্দোলন, দাবি আদায় ও গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ায়।
৩. রাজনৈতিক দলের নজর – প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ডাকসু নেতাদের জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসতে আগ্রহী। কারণ তারা তরুণ নেতৃত্বের প্রতীক।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট
১৯৯০ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময় ডাকসু নির্বাচন হয়নি। ফলে ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে যাত্রার ধারা কিছুটা ব্যাহত হয়। ২০১৯ সালে নির্বাচন হলেও নিয়মিততা ফিরে আসেনি। তবুও নুরুল হক নূর মতো নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
ডাকসু থেকে জাতীয় রাজনীতিতে যাত্রা একটি দীর্ঘদিনের প্রথা। তবে এখনকার সময়ে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নানা বিতর্ক, সংঘর্ষ ও দলীয় প্রভাবের কারণে এই ধারা কিছুটা ভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকেই মনে করেন, যদি নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন হতো তবে আরও দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব জাতীয় রাজনীতিতে আসতে পারত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু কেবল একটি ছাত্র সংসদ নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির “প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র”। ভিপি ও জিএসদের পথচলা প্রমাণ করে যে ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব দেশের সংসদ, মন্ত্রিসভা এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনায় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ভবিষ্যতে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় রাজনীতি আরও শক্তিশালী নেতৃত্ব পেতে পারে।