পাহাড়ে তখন উত্তপ্ত অবস্থা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনীর প্রায়ই সংঘর্ষ চলছে। এছাড়া, কয়েকটি পাহাড়ি সংগঠন বিভ্ন্নি কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। এমন এক সময়ে, ১৯৯৬ সালের ১১ জুন দিবাগত রাতে অর্থাৎ সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগের রাতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে মানবাধিকারকর্মী কল্পনা চাকমা অপহরণ হন। এরপর তার আর কোনো খোঁজ মেলেনি তার। ঘটনার পরদিন কল্পনা চাকমার পরিবারের পক্ষ থেকে বাঘাইছড়ি থানায় মামলা করা হয়।
এদিকে কল্পনাকে উদ্ধারের দাবিতে ২৭ জুন পিসিপি তিন পার্বত্য জেলায় হরতালের ডাক দেয়। হরতাল চলার সময় বাঘাইছড়িতে পিসিপির মিছিলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে মৃত্যু হয় পিসিপির রুপম, সুকেশ, মনতোষ ও সমর বিজয় চাকমার।
সে সময় অপহরণের জন্য রাঙামাটিতে তখনকার কর্মরত সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কল্পনার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়। পাহাড়িসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তিও দাবি করা হয়।
কল্পনা চাকমা ছিলেন মানবাধিকার কর্মী ও নারীবাদী। পাহাড়ের নারী অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করতেন। এছাড়া তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক সংগঠন ‘হিল উইমেন্স ফেডারেশন’ -এর সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
কল্পনা চাকমা অপহরণ হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ এবং বহির্বিশ্বে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর পাশাপাশি মানবাধিকার এবং নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
কল্পনা চাকমার পরিবার এই অপহরণের জন্য বরাবরই অপহরণকারী হিসেবে তৎকালীন সময়ের সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনা দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সরকার অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আব্দুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সাথে সরকার পুলিশ বিভাগের মাধ্যমেও তদন্ত পরিচালনা করে।
কল্পনা চাকমার পরিবার তার সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো খবর না পাওয়ায় এখনো তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা থেকে বিরত রয়েছেন।

অপহরণের শিকার হওয়া কল্পনা চাকমা। ছবি: সংগৃহীত
মামলা ও তদন্ত
কল্পনা চাকমা অপহরণের অভিযোগে হওয়া মামলার প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২১ মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দেয় পুলিশ। তখন মামলার বাদী ও অপহৃতার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা তা প্রত্যাখ্যান করে ঘটনার পুনঃতদন্তের দাবি করেন।
২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি রাঙামাটির চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে না-রাজি দেন মামলার বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা। শুনানি শেষে বিচারক বিষয়টি নিয়ে ১৬ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখ পরবর্তী আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করেন। এদিন শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা সিআইডির রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের আদেশ চাইলে আদালতও সিআইডির প্রতিবেদন নিয়ে সংশয়ের কথা জানান এবং উপর্যুক্ত আদেশ দেন।
২০১৬ সালে আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে রাঙামাটির ওই সময়কার পুলিশ সুপার সৈয়দ তারিকুল হাসানকে এ মামলার তদন্তভার দেন। তিনি দুই বছর পর ২০১৮ সালে কারও বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ না পাওয়ার তথ্য জানিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ প্রতিবেদনেও সেসময় নারাজি দিয়েছিলেন কল্পনার ভাই।
বাদীর নারাজি নিয়ে কয়েক দফা শুনানি হয়। সেই নারাজি আবেদনের সর্বশেষ শুনানি শেষে আবেদনটি নামঞ্জুর করে আদালত। ফলে ২০১৮ সালে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার দ্বিতীয় দফায় তদন্ত শেষে আদালতে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন সেটিই বহাল থাকে।
এতে কল্পনা চাকমা অপহৃত হলেও কে বা কারা করেছে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, বলে দেওয়া চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনই বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন কল্পনার ভাই কালিন্দী কুমার চাকমার আইনজীবী সুস্মিতা চাকমা।
চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে কারও দায় পাওয়া না যাওয়ায় কল্পনার ভাইয়ের মামলাটির বিচার আর এগোবে না। এর ফলে ২৮ বছর আগের অপহরণের মামলাটির অবসান হয়।

স্বামী অরুণ বিকাশ চাকমার সঙ্গে নারী নেত্রী কল্পনা চাকমা। ছবি: সংগৃহীত