1. [email protected] : মো: সরোয়ার সরদার : মো: সরোয়ার সরদার
  2. [email protected] : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক
  3. [email protected] : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি
  4. [email protected] : Sadak Mostafa : Sadak Mostafa
  5. [email protected] : বিশেষ প্রতিনিধি : বিশেষ প্রতিনিধি
  6. [email protected] : Yousuf Mahmud : Yousuf Mahmud
বালাকোটের রক্তাক্ত শুক্রবার: ৭০০ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ১০ হাজার সৈন্য | ঢাকা আওয়ার
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন

বালাকোটের রক্তাক্ত শুক্রবার: ৭০০ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ১০ হাজার সৈন্য

ওমর মুখতার
  • বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও মুসলিম পুনর্জাগরণের ইতিহাসে ১৮৩১ সালের বালাকোট যুদ্ধ এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি ছিল পরাধীনতা, ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক আদর্শিক সংগ্রাম। ইতিহাসের এই রক্তঝরা প্রান্তরে আত্মত্যাগ করেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা সাইয়েদ আহমাদ বেরলভি ও তাঁর সাহসী সাথীরা। আর সেই মহান যুদ্ধে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন চট্টগ্রামের বীর সাধক হজরত শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী, যিনি পরবর্তীতে গাজীয়ে বালাকোট উপাধিতে ভূষিত হন।

ইতিহাসের মহানায়ক ও আন্দোলনের পটভূমি

১৭৮৬ সালে ভারতের অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন সাইয়েদ আহমাদ বেরলভি। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয় ও বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের ধারক। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আধিপত্য ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। একই সময়ে পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে শিখ শাসক মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের শাসনে মুসলমানদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মর্যাদা হারিয়ে মুসলমান সমাজ তখন দিশেহারা।

এই পরিস্থিতিতে সাইয়েদ আহমাদ বেরলভি তরীকায়ে মুহাম্মাদিয়া আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার, ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল কুরআন ও সহিহ হাদিসভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে জিহাদ আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।

রণক্ষেত্র বালাকোট: পাহাড়বেষ্টিত প্রাকৃতিক দুর্গ

কাশ্মীর অভিমুখী অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে সাইয়েদ আহমাদ বেছে নেন বালাকোটকে। বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলের এই পাহাড়ি উপত্যকা ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত কুনহার নদী, পূর্বে কালুখান পাহাড় এবং পশ্চিমে মেটিকোট শিখর বালাকোটকে প্রাকৃতিক দুর্গে পরিণত করেছিল।

১৮৩১ সালের ১৭ এপ্রিল সাইয়েদ আহমাদ তাঁর মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে বালাকোটে প্রবেশ করেন। একজন দক্ষ সমরকুশলী হিসেবে তিনি জানতেন, শিখ বাহিনী মূলত দুটি পথ দিয়ে এখানে পৌঁছাতে পারে, কুনহার নদীর পূর্ব তীর ধরে কিংবা ভুগাড়মুঙ্গের গিরিপথ অতিক্রম করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর উহুদ যুদ্ধের রণকৌশল অনুসরণ করে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি পথগুলোতে প্রতিরক্ষামূলক চৌকি স্থাপন করেন।

বিশেষ করে মেটিকোট পাহাড় ছিল যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণকারী স্থান। স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রবাদ ছিল মেটিকোট যার দখলে, বালাকোট তার দখলে।

অসম যুদ্ধ: ৭০০ বনাম ১০ হাজার

১৮৩১ সালের ৬ মে, শুক্রবার। ২৪ জিলকদ ১২৪৬ হিজরি। বালাকোটের আকাশে যুদ্ধের চূড়ান্ত দামামা বেজে ওঠে। শিখ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন শের সিং। তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার। বিপরীতে সাইয়েদ আহমাদের মুজাহিদ বাহিনীর যোদ্ধা ছিলেন মাত্র ৭০০ জন।

শিখ সৈন্যরা আগেই কুনহার নদীর ওপর কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেছিল। সেই পথ ব্যবহার করে তারা সোহাল নাজাফ খান গ্রামের দিক দিয়ে অগ্রসর হয়ে মেটিকোট পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে যায়। মুজাহিদ বাহিনীর অগ্রবর্তী চৌকির নেতা মীর্যা আহমাদ বেগ খান বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও সংখ্যাধিক্যের কাছে তাঁরা টিকতে পারেননি।

শিখ বাহিনী যখন মেটিকোট পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান নিতে সক্ষম হয়, তখন কার্যত যুদ্ধের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে যায়।

বিশ্বাসঘাতকতার নীল নকশা

ঐতিহাসিকদের বিশ্লেষণে বালাকোটের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। যেসব স্থানীয় সামন্ত ও উপজাতীয় নেতা প্রথমে সাইয়েদ আহমাদকে শিখদের বিরুদ্ধে সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছিল, তারাই পরে গোপনে শিখ বাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে।

প্রথমত, কিছু স্থানীয় মুসলিম জমিদার ও খান শিখদের কাছে মুজাহিদদের অবস্থান ও কৌশল ফাঁস করে দেয়। দ্বিতীয়ত, মেটিকোট পাহাড়ে পাহারার দায়িত্বে থাকা বাহিনীতে অনুপ্রবেশকারী কিছু ব্যক্তি শিখদের গোপন পথ দেখিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, হাযারা অঞ্চলের এক উপজাতীয় প্রধান শিখদের পাহাড়ের ওপর ওঠার একটি গোপন রাস্তার সন্ধান দেয়।

এই বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই শিখ বাহিনী মেটিকোটের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।

রক্তে লাল মেটিকোটের পাদদেশ

সেদিন জুমার দিন। সাইয়েদ আহমাদ ও তাঁর সঙ্গীরা মসজিদে বালা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। শিখদের অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে তিনি মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে মেটিকোটের পাদদেশের দিকে এগিয়ে যান।

প্রথম আক্রমণেই বহু শিখ সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু পাহাড়ের প্রতিটি অংশ তখন শিখ বাহিনীতে পূর্ণ। চারদিক থেকে তারা মুজাহিদদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সাইয়েদ আহমাদ বেরলভি মুজাহিদদের অগ্রভাগে থেকে যুদ্ধ করছিলেন। তাঁর পাশে ছিলেন শাহ ইসমাইল শহীদ। এক পর্যায়ে মেটিকোটের ঝরনার কাছে ভয়াবহ সংঘর্ষে তাঁরা শাহাদাত বরণ করেন। ইতিহাসে তাঁর শাহাদাত নিয়ে নানা বর্ণনা পাওয়া যায়। কেউ বলেন, তাঁর খণ্ডিত দেহ নদীর ধারে পাওয়া গিয়েছিল। আবার কেউ বলেন, তাঁর মাথা কয়েক মাইল দূরে ভাটিতে পাওয়া যায়।

প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই অসম যুদ্ধে মুজাহিদদের প্রায় ৩০০ জন শহীদ হন। অন্যদিকে ৭০০ থেকে ১০০০ শিখ সৈন্য নিহত হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

বাংলার বীর: গাজীয়ে বালাকোট শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী

বালাকোট যুদ্ধের ইতিহাসে বাংলার গৌরবোজ্জ্বল নাম শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী (রহ.)। আনুমানিক ১৭৯০ সালে নোয়াখালীতে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মোহাম্মদ ফানাহ ছিলেন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে সেখানে শিক্ষকতাও করেন।

তিনি ছিলেন উচ্চমানের আলেম, মুহাদ্দিস ও সাধক। কলকাতায় তিনি সাইয়েদ আহমাদ বেরলভির হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং জিহাদ আন্দোলনে যোগ দেন।

বালাকোট যুদ্ধে তিনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। দিনের বেলা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করতেন, আর রাতের বেলা তাহাজ্জুদের নামাজে অশ্রুসিক্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতেন। এই যুদ্ধ থেকে জীবিত ফিরে আসার পর তিনি গাজীয়ে বালাকোট নামে পরিচিতি লাভ করেন।

তাঁর ব্যবহৃত ঐতিহাসিক শেরওয়ানি আজও চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মলিয়াইশ গ্রামে তাঁর বংশধরদের কাছে সংরক্ষিত আছে। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাদরাসা, মসজিদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

যুদ্ধের পর: ধ্বংস, আগুন ও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস

যুদ্ধ শেষে শিখ বাহিনী বালাকোটের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। শুধু ঘরবাড়িই নয়, পুড়ে যায় সাইয়েদ আহমাদ ও শাহ ইসমাইল শহীদের অমূল্য পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র ও গবেষণাকর্ম। তাঁর রোজনামচাভিত্তিক গ্রন্থ নূর-ই আহমদী এই আগুনে ধ্বংস হয়ে যায়। এতে সামরিক ক্ষতির সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ও নেমে আসে।

যুদ্ধের পর অবশিষ্ট মুজাহিদরা পাহাড়ে আশ্রয় নেন। অনেকেই বিশ্বাস করতেন সাইয়েদ আহমাদ এখনও জীবিত আছেন। পরে তাঁর শাহাদাত নিশ্চিত হলে আন্দোলনের নেতৃত্বে সাময়িকভাবে অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।

শেয়ার করুন

এই বিষয়ের আরও সংবাদ