একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি তার ব্যবসায়িক জগতের ওপর নির্ভরশীল, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কথাটি আরও প্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ, চীন তার ব্যবসায়িক কৌশল এবং দক্ষতার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তেমন নয়, তবে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতিতে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা অপরিসীম। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, দেশের কয়েকটি শীর্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অবদানে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আজকে আমরা এমনই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গল্প জানব, যাদের কাঁধে চেপে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।
সিটি গ্রুপ: সরিষার তেল থেকে শুরু করে বিশাল সাম্রাজ্য
সিটি গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল সরিষার তেল উৎপাদনের মাধ্যমে। কিন্তু আজ তারা খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। ফজলুর রহমানের দূরদর্শিতা এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলে আজ সিটি গ্রুপ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রুপ বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত হয় এবং প্রতি বছর ১০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করে।
ইউনাইটেড গ্রুপ: শূন্য থেকে শীর্ষে
১৯৭৮ সালে কিছু বন্ধুদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড গ্রুপ। আজ দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই গ্রুপের ব্যবসা পরিসর হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রেস্তোরাঁ, আবাসন, হোটেল, বেসরকারি বন্দরসহ বিস্তৃত। তাদের সম্পত্তির মোট পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

ইউনাইটেড গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান
আকিজ গ্রুপ: বিড়ি থেকে করদাতা
আকিজ গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ছোট বিড়ি কারখানা দিয়ে। আজ এটি দেশের অন্যতম বড় করদাতা প্রতিষ্ঠান। বিড়ি থেকে শুরু করে বর্তমানে টেক্সটাইল, তামাক, সিরামিক, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং, ওষুধ, ভোক্তা পণ্য সহ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের উপস্থিতি রয়েছে। এই গ্রুপের অধীনে ৭০ হাজারেরও বেশি কর্মচারী কাজ করে এবং এটি কয়েক বছর ধরে সর্বোচ্চ করদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে।
টি কে গ্রুপ: পুষ্টি তেল থেকে বিশাল সম্পদ
১৯৭২ সালে পুষ্টি তেল বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসার শুরু করা টি কে গ্রুপ আজ একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। তাদের ব্যবসার পরিধি জাহাজ ভাঙার কারখানা, স্টিল মিল, চা বাগান, কাগজ মিল ইত্যাদি বিস্তৃত। ৩০ হাজার কর্মচারী নিয়ে তারা বর্তমানে দেশের শীর্ষ ধনী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।
স্কয়ার গ্রুপ: মশলা থেকে ব্যাংকিং
রাঁধুনি গুঁড়া মশলা থেকে শুরু করে স্কয়ার ফার্মাসিটিক্যাল, টয়লেট্রিজ এবং কনজ্যুমার প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে স্কয়ার গ্রুপের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। স্যামসাং এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রুপ ব্যাংকিং ও রিয়েল এস্টেটসহ নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত এবং ৩০ হাজার কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
বেক্সিমকো গ্রুপ: ফার্মা, টেলিকমসহ বিভিন্ন খাতে সক্রিয়
বেক্সিমকো গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রুপ, বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসার অঙ্গনে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে যাদের নাম উল্লেখযোগ্য, তাদের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান আয়াজ সাদাত এবং তার পরিবার বিশেষভাবে পরিচিত।
টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনভেস্টমেন্ট ও রিয়েল এস্টেট, এনার্জি ও পাওয়ার, স্বাস্থ্যসেবা, আইটি ও টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের বিশাল ব্যাবসা রয়েছে।
আবুল খায়ের গ্রুপ: স্টিল, সিরামিকস, তামাকসহ বিভিন্ন খাতে সক্রিয়
আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের একটি প্রখ্যাত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের ১৯৫৩ সালে ব্যবসার শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এই গ্রুপ দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়িক সংস্থা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করে। আবুল খায়ের গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিসর বিস্তৃত এবং বৈচিত্র্যময়। তাদের প্রধান ব্যবসার মধ্যে রয়েছে, তামাক শিল্প, স্টিল, সিরামিকস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ফার্মাসিউটিক্যালস, গার্মেন্টস ইত্যাদি। এই গ্রুপটি এখন নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের দিকে নজর দিচ্ছে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের আরও বেশি উদ্ভাবনী হতে হবে।