নিজেদের মধ্যে হানাহানি, মারামারি, ভেদাভেদ ভুলে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি করলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআইর মতো সংস্থাগুলোকে দুর্বল না করে সহযোগিতা করার জন্য বলেছেন সেনাপ্রধান। চলতি বছরের ডিসেম্বর বা এর কাছাকাছি সময়ে সরকার জাতীয় নির্বাচন দেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে ‘পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী শহীদ অফিসারদের স্মরণে’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বেশকিছু বিষয়ে সতর্ক করে এমন বক্তব্য দেন সেনাবাহিনী প্রধান।
নিজের অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই উল্লেখ করে দেশের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আজকে আমি পরিষ্কার করে কথা বলতে চাই। সবার ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করেন, আপনারা যদি আমার এটা গ্রহণ করেন, আপনারা লাভবান হবেন, দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। আমার অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। আমার একটাই আকাঙ্ক্ষা, দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে ছুটি করা। আই হেড এনাফ ফর লাস্ট সেভেন, এইট মান্থস। আই হেড এনাফ। আমি চাই, দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে আমরা সেনানিবাসে ফেরত আসব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনীর প্রতি আক্রমণ করবেন না। একটা সাধারণ (কমন) জিনিস আমরা দেখতে পাচ্ছি, কারও কারও সেনাবাহিনী এবং সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতি বিদ্বেষ। কী কারণে, এটা আজ পর্যন্ত আমি খুঁজে পাইনি।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্য করেন। আমাদের আক্রমণ করবেন না। আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। আমাদের উপদেশ দেন। আমরা ভালো উপদেশ গ্রহণ করব। আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই। দেশ এবং জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কাজ করি। দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই। যেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা বাস করবে। তাদের জন্য আমরা এমন স্থান রেখে না যাই, যেখানে হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি হবে। তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই দেশে থাকতে পারবে না।’
উচ্ছৃঙ্খল কাজগুলো নিজেদের তৈরি: সেনাপ্রধান বলেন, ‘এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর নয়। দুই লাখ পুলিশ আছে, বিজিবি আছে, র্যাব আছে, আনসার-ভিডিপি আছে। আমার আছে ৩০ হাজার সৈন্য। এই যে বিরাট শূন্যতা (ভয়েড), ৩০ হাজার সৈন্য দিয়ে আমরা কীভাবে পূরণ করব। ৩০ হাজার থাকে, আবার ৩০ হাজার চলে যায় ক্যান্টনমেন্টে, আরও ৩০ হাজার আসে। এটা দিয়ে আমরা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
উচ্ছৃঙ্খল কাজগুলো নিজস্ব তৈরি উল্লেখ করে জেনারেল ওয়াকার বলেন, ‘এখানে যে সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল কাজ হয়েছে, সেটা আমাদের নিজস্ব তৈরি। এটা আমাদের নিজস্ব ম্যানুফেকচারড। এই বিপরীতমুখী কাজ করলে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না। জিনিসটা আপনাদের মনে রাখতে হবে।’
সবাইকে সতর্ক করে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘আসুন, আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি না করে ঐক্যবদ্ধ থাকি। সবাই যেন একসঙ্গে থাকতে পারি, সেদিকে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের মধ্যে মতোবিরোধ থাকতে পারে, চিন্তাচেতনার বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু দেশ ও জাতির দিকে খেয়াল রেখে আমরা যেন এক থাকতে পারি। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়তে যাবে। ওইদিকে আমরা যেতে চাই না। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। পরে বলবেন, আমি আপনাদের সতর্ক করে দিইনি। আপনারা যদি নিজেদের ভেদাভেদ ভুলে কাজ করতে না পারেন, নিজেরা যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি কাটাকাটি করেন, এই দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। আমি আজকে বলে দিলাম। নইলে আপনারা বলবেন সতর্ক করিনি। এই দেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি। সেই উদ্দেশ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে ব্যস্ত, একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি। তারা (অপরাধীরা) খুব ভালোভাবেই জানে, যদি এই সময় এসব অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সেই কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংগঠিত থাকি, একত্রিত থাকি, তাহলে অবশ্যই সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’
সংস্থাগুলোকে দুর্বল না করার আহ্বান: অতীতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআইর মতো সংস্থাগুলোর কাজকে কৃতিত্ব দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান। তাদের দুর্বল (আন্ডারমাইন) না করার আহ্বান জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই—এগুলো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে অতীতে। খারাপ কাজের সঙ্গে অসংখ্য ভালো কাজ করেছে। আজ দেশের যে স্থিতিশীলতা, দেশটাকে যে এত বছর ধরে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, এটার কারণ হচ্ছে এই সশস্ত্রবাহিনীর বহু সেনাসদস্য, সিভিলিয়ান সবাই মিলে এই সংস্থাগুলোকে কার্যকর রেখেছে। সেজন্য আমরা এতদিন ধরে একটা সুন্দর পরিবেশ পেয়েছি। এর মধ্যে যারা কাজ করেছে, কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে তার শাস্তি হবে। অবশ্যই শাস্তি হতে হবে, না হলে এই জিনিস আবার ঘটবে। আমরা সেটা বন্ধ করতে চাই, চিরতরে। কিন্তু তার আগে মনে রাখতে হবে, আমরা এমনভাবে কাজ করব, যেন এই সংস্থাগুলো আন্ডারমাইন না হয়।’
তিনি বলেন, ‘আজকে পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন না, এর বড় একটা কারণ হচ্ছে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা, অনেকে জেলে। র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই ভীত (প্যানিকড), বিভিন্ন দোষারোপ, গুম-খুন ইত্যাদির তদন্ত চলছে। অবশ্যই তদন্ত হবে, দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু এমনভাবে কাজটা করতে হবে, যেন সংস্থাগুলো আন্ডারমাইন না হয়। এই সংস্থাগুলো আন্ডারমাইন করে যদি আপনারা মনে করেন দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে, সবাই শান্তিতে থাকবেন, এটা হবে না। সেটা সম্ভব না, আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি।’
স্বাধীন, সুষ্ঠু অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের দিকে সরকার: চলতি বছরের ডিসেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে উল্লেখ করে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, ‘দেশ একটা ফ্রি, ফেয়ার, ইনক্লুসিভ ইলেকশনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তার আগে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার সেদিকে খেয়াল করবে। আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি সম্পূর্ণভাবে আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। দেয়ার শুড বি এ ফ্রি, ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন। অ্যান্ড ইলেকশন শুড বি ইন ডিসেম্বর অর ক্লোজ টু দ্যাট। যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে, ১৮ মাসের মধ্যে একটা ইলেকশন…। আমার মনে হয় সরকার সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন দেশটাকে ইউনাইটেড রাখতে। উনাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে। উনি যেন সফল হতে পারেন।’
বিডিআর হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর সদস্য দ্বারা সংঘটিত: পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী শহীদ অফিসারদের স্মরণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার বলেন, ‘আজ একটা বেদনাবিধুর দিবস। বিগত ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ৫৭ জন চৌকস অফিসারকে শুধু নয়, আমরা কিছু পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছি। অনেকে ছবিতে দেখেছেন, তবে আমি এ বর্বরতার চাক্ষুষ সাক্ষী। একটা জিনিস আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, এই বর্বরতা কোনো সেনাসদস্য করেননি। সম্পূর্ণটাই তদানীন্তন বিডিআর সদস্য দ্বারা সংঘটিত, ফুল স্টপ। এখানে কোনো ইফ এবং বাট (যদি এবং কিন্তু) নেই। এখানে যদি ইফ এবং বাট আনেন, এই যে বিচারিক কার্যক্রম এতদিন ধরে হয়েছে, ১৬-১৭ বছর ধরে যারা জেলে আছে, যারা সাজাপ্রাপ্ত, সেই বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। এই জিনিসটা আমাদের খুব পরিষ্কার করে মনে রাখা প্রয়োজন। এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে নষ্ট করবেন না।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘যেসব সদস্য শাস্তি পেয়েছেন, তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। এখানে কোনো রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জড়িত ছিল কি না, বাইরের কোনো শক্তি জড়িত ছিল কি না, সেটা কমিশন বের করবে এবং আপনাদের জানাবে। আমাদের এই চৌকস সেনাসদস্যরা যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা প্রাণ হারিয়েছেন তদানীন্তন বিডিআর সদস্যদের গুলিতে। আমরা এসব জিনিস নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছি কেউ কেউ। এই জিনিসটাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। সেটা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।’
তিনি বলেন, আমি আজ কিছু উপদেশ দিয়ে যাব, সেটা যদি আপনারা গ্রহণ করেন, তাহলে লাভবান হবেন। আমরা নিজেরা ভেদাভেদ সৃষ্টি না করি। আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। আমাদের মধ্যে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, কোনো ব্যত্যয় থেকে থাকে, সেটা আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব। এটার জন্য ডানে-বামে দৌড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। নিজের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হবে না, আমি আপনাদের এই জিনিসটা নিশ্চিত করে দিচ্ছি।’
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘কিছু কিছু সদস্যের দাবি, তারা ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন শাস্তি পেয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন তারা অযাচিতভাবে শাস্তি পেয়েছেন, এটার জন্য আমি একটা বোর্ড করে দিয়েছি। একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সেই বোর্ডের সদস্য। প্রথম ধাপে ৫১ জন সদস্যের ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ (রিকমেন্ডেশন) নিয়ে এসেছে। রিকমেন্ডেশনের অধিকাংশই আমি গ্রহণ করেছি এবং আরও বেশি আমি দিয়েছি। নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীও তাদের এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, সেটার জন্য ছাড় হবে না, বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। আমি আপনাদের পরিষ্কার করে দিচ্ছি, এটি একটি ডিসিপ্লিন ফোর্স, ডিসিপ্লিন ফোর্সকে ডিসিপ্লিন থাকতে দিন।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আজকে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সমস্ত বাহিনী, সমস্ত অর্গানাইজেশন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খালি সেনাবাহিনী টিকে আছে, বিমানবাহিনী টিকে আছে, নৌবাহিনী টিকে আছে, কেন? কারণ ডিসিপ্লিন। তারপরও আমার অফিসারদের আদেশ দিয়েছি, কারও বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে, অপরাধী কি না সে ব্যাপারে যদি সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকে, তাহলে সেটা তাদের পক্ষে যাবে। পর্যায়ক্রমে অফিসাররা আবেদন করতে আসবে, আমরা তাদের আবেদনগুলো দেখব। যদি মনে হয় কিছু করার অবকাশ আছে, আমরা অবশ্যই করব।’