বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সোমবার (৫ আগস্ট)। ফেসবুকে এক পোস্টে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এদিনের কর্মসূচির পরিকল্পনা লেখেন।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ঘোষিত পয়েন্টগুলোতে ঢাকার আন্দোলনকারী ও লংমার্চ করে ঢাকায় আসা জনতা অবস্থান নিবে সকাল ১১টা থেকে। শহীদ মিনারে ১১টা থেকে সবাই জড়ো হবেন।
তিনি লেখেন, ‘শহীদ মিনার থেকে মিছিল নিয়ে আমরা শাহবাগে যাব, কেন্দ্রীয় সমাবেশ শাহবাগে হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়া হবে শাহবাগ থেকে। পয়েন্টগুলোতেও সে সংবাদ পৌঁছে দেয়া হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের ঘোষণা করা তিন দিনের সাধারণ ছুটি শুরু হয় সোমবার থেকে। বুধবার পর্যন্ত এই বিশেষ ছুটির কথা বলা হয়। একই সাথে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউর কথাও ঘোষণা করা হয়।
ঢাকার রাস্তা ফাঁকা, সেনাবাহিনীর টহল
বৈষম্যবিরাধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংসতায় আশঙ্কায় ঢাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে সকাল থেকেই। নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করে সরকার। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন মোড়ে অবস্থানের পাশাপাশি নিয়মিত টহল অব্যাহত রাখে।
সেনাবাহিনীর বাধা উপেক্ষা বিক্ষোভকারীদের
দুপুর ১২টার দিকে ঢাকার উত্তরার আজমপুর থেকে রাজলক্ষী পর্যন্ত মূল সড়কে হাজার হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে আসার খবর পাওয়া যায়। খরব পাওয়া যায় সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভের।
শাহবাগে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা
শাহবাগ অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে তারা শাহবাগে আসতে শুরু করেন।
বেলা ১টার পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সেখানে আসতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে বাঁধা দিলেও সেটি উপেক্ষা করে শাহবাগে অবস্থান নেন তারা।
কয়েক হাজার মানুষ সেখানে অবস্থান নিয়ে সরকার পতনের একদফা আদায়ে স্লোগান দেয়।
এছাড়া উত্তরা, রামপুরাসহ ঢাকার আরো কয়েকটি এলাকা থেকে বেশ কয়েক হাজার আন্দোলনকারী শাহবাগের উদ্দেশে রওনা হয় বলে জানা যায়।
সেনাপ্রধানের ভাষণের ঘোষণা
দুপুর ১টার দিকে ঘোষণা দেয়া হয় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। দুপুর ২টায় ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও সময় পিছিয়ে দেয়া হয়।
এর আগে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে সেনাপ্রধানের ভাষণ পর্যন্ত সকলকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানানো হয়।
এর আগে, কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা আবার চালু করা হয়। সোমবার সকাল পর্যন্ত ধীরগতিতে চললেও সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ব্রডব্যান্ড সেবা। এর আগে, রোববার মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়।
দেশের সব নেতাদের সাথে সেনাপ্রধানের আলোচনা
বর্তমান সঙ্কট নিরসনে দেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)। সেখানে বলা হয়, সঙ্ঘাত-সহিংসতা পরিহার করে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সেনাপ্রধান।
ফলে বেলা ৩টায় সেনাপ্রধানের নির্ধারিত জাতির উদ্দেশে ভাষণ আরও কিছুটা পেছাতে পারে বলে জানা যায়।
যা বললেন সজীব ওয়াজেদ জয়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে, দেশে এক মিনিটের জন্যও কোনো অনির্বাচিত সরকার না আসতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এখন (সবার) দাবি সরকারের পতন। সরকারের পতন হওয়ার পর কী হবে? এটা কেউ ভেবেছে? এখন যদি সরকার পতনের দাবি মেনে নেয়া হয়। তখন কী হবে? তারা এই সরকারের অধীনে নির্বাচন মানবে না।
পদত্যাগ করে সপরিবারে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর সাথে তার বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের সদস্যরা দেশ ত্যাগ করেন। তাকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি এএফপিকে বলেন, ‘তিনি এবং তার বোন গণভবন ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। তিনি একটি বক্তব্য রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন, তবে তাকে সেই সুযোগ দেয়া হয়নি।’
তার পদত্যাগে আন্দোলনকারীদের উল্লাসে ফেটে পড়তে দেখা যায়।
গণভবন প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা
শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর গণভবন প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন আন্দোলনকারীরা। নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে বেলা ৩টার দিকে তারা গণভনে ঢুকে পড়েন।
অনেকেই গণভবনের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। চেয়ার-টেবিলসহ বেশকিছু জিনিসপত্র নিয়ে বের হতেও দেখা গেছে বেশ কয়েকজনকে। আবার অনেকের হাতে গণভবনের পুকুরের মাছ দেখা গেছে।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন সেনাপ্রধান
বেলা ৪টার দিকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। আমরা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাব, সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করব। আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।’
সোমবার রাতের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে তিনি জানান।
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনারা দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। মারামারি করে আমরা আর কিছু পাব না। সুতরাং দয়া করে আপনারা সমস্ত ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বিরত হন। প্রতিটা অন্যায়ের বিচার হবে।’
আলোচনায় কারা কারা ছিলেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের আমির, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা, জাতীয় পার্টির নেতারা, সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা।
তবে সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না বলে তিনি জানান।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগ কী বার্তা দেয়?
বাংলাদেশে কোটা সংস্কারকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনের সূত্রপাত, তার একটি পরিণতি দেখা গেলো আজ সোমবার শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে। সরকারকে শুরু থেকেই এই আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীদের অনেকটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা ছিল, এমনকি এক সপ্তাহের ব্যবধানে শত শত মৃত্যুর পরও পুরো বিষয়টিকে শুধুমাত্র বিরোধীদের ষড়যন্ত্র, এমনকি জঙ্গি হামলা হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে সরকার।
তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পনের বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়ার স্লোগান, দেয়ালে দেয়ালে ‘স্বৈরাচার’ লেখা কোনোকিছুই যেন আওয়ামী লীগকে স্পর্শ করেনি।
যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে সামান্য সমালোচনার জন্যও মানুষকে জেলে যেতে হয়েছে, হয়রানির শিকার হতে হয়েছে- তার বিরুদ্ধে রাস্তায় জ্বালাময়ী স্লোগান, সামাজিক মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের ঠাট্টা-বিদ্রুপ যে বার্তা দিয়েছে সেটিতে তারা অবজ্ঞা করেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এই রাজনৈতিক দলটি আক্ষরিক অর্থেই ‘দেয়ালের লিখন’ পড়তে পারেনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ১৯৯০ এর গণঅভ্যূথ্থানের ৩৪ বছর পর আরেকটি গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন হলো, তবে সেটি হলো দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই যেমন স্পষ্ট ছিল যে এই দাবি শেষপর্যন্ত সরকারকে মেনে নিতে হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের এক দফা ঘোষণার পরও পরিষ্কার ছিল সাধারণ মানুষের এত ক্ষোভ এবং ঘৃণা নিয়ে কোনো সরকার টিকতে পারে না।
এই রক্তপাত হয়তো ঠেকানো যেতো, কিন্তু সেই চেষ্টা আন্তরিকভাবে সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।
সর্বময় ক্ষমতা এখানে শুধু নীতিভ্রষ্টই করেনি, বাস্তবতা থেকে অন্ধ করে দিয়েছে।
ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, যেকোনো সমালোচককে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা- এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সেটি দেখতে না পারাটা শুধুমাত্র দাম্ভিকতারই ইঙ্গিত দেয়।
কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে তখনি ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করতে হয়, যখন তার সেই ক্ষমতা শুধু ক্ষমতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, এর পেছনে জনসমর্থন থাকে না।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বে সেই বার্তাটাই দিলেন।
সূত্র : বিবিসি ও অন্যান্য