রাজধানী ঢাকার পাশে মানিকগঞ্জের একটি ধানক্ষেতে কৃষক দিলীপ কুমার বিশ্বাস সোলার প্যানেলের ছায়ায় বেড়ে ওঠা ফসলের পরিচর্যা করছেন৷ এটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগের অংশ৷ যাচাই করে দেখা হচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে একই জমিতে খাদ্য ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ দুটো উৎপাদন করা সম্ভব কিনা৷
১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশটি তার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে প্রায় ৯৫ শতাংশই নির্ভর করে আমদানির ওপর৷ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির
দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে৷ জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনার অন্যতম উপায় হিসেবে দেশটি নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে৷
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রধান উৎস হলো সৌরশক্তি৷ তবে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র সাড়ে চার শতাংশ আসে এই উৎস থেকে৷
সমস্যা হলো, সোলার প্যানেল সাধারণত বাড়ির ছাদে অথবা মাটিতে স্থাপন করা হয়৷ কিন্তু ছাদের জায়গা সীমিত এবং মাটিতে প্যানেল স্থাপন করতে কৃষি বা বসতবাড়ির জমি ব্যবহার করতে হয়৷
জলবায়ু ন্যায়বিচার বিষয়ক প্রচারণাকারী সংগঠন ইউথনেট গ্লোবাল- এর নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে জমির স্বল্পতা রয়েছে, ফলে খাদ্য ও জ্বালানির চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটা অত্যন্ত জরুরি৷”
গবেষকরা এখন ‘অ্যাগ্রিভোল্টাইক’ বা কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মতো একটি উদীয়মান প্রযুক্তির দিকে নজর দিচ্ছেন৷ এই ব্যবস্থায় একই জমিতে সোলার প্যানেলের পাশাপাশি ফসল ও গবাদি পশুর লালন-পালন করা সম্ভব৷
বাংলাদেশের উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অফ গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট- বিআইজিডি যৌথভাবে এ বছর একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করেছে৷ এর আওতায় ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে মানিকগঞ্জের কৃষিজমির ওপর সোলার প্যানেল স্থাপন করা হচ্ছে৷ সুইডিশ পোশাক ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম- এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অলাভজনক সংস্থা এইচঅ্যান্ডএম ফাউন্ডেশন এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে৷
ভারত ও পাকিস্তান শুষ্ক অঞ্চলে বিশাল আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র (ফটোভোলটাইক পাওয়ার পার্ক) গড়ে তুললেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় পরিসরে এমন পতিত জমির প্রাপ্যতা খুবই সীমিত৷ জমি ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কার কারণে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের আগের প্রস্তাবগুলো বাতিল করা হয়েছিল৷
ভূগর্ভের উত্তাপ থেকে জ্বালানি
তবে মানিকগঞ্জে সৌর প্যানেলগুলো মাটি থেকে ২ মিটারেরও বেশি উঁচুতে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন মাত্রায় সূর্যের আলো নীচে থাকা ফসলের ওপর পড়তে পারে৷
গবেষকরা বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতিবেগ এবং স্থানীয় আবহাওয়ার (মাইক্রোক্লাইমেট) অন্যান্য তথ্য পরিমাপ করছেন৷ প্যানেলের উচ্চতা, পারস্পরিক দূরত্ব এবং ফসলের কোন বিন্যাসটি খাদ্য উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সর্বোত্তম ভারসাম্য বজায় রাখে, তা যাচাই করতে তারা নিকটবর্তী সাধারণ কৃষি জমি বা কন্ট্রোল প্লট এর ফসলের ফলনের সঙ্গে এর তুলনা করবেন৷
ধান, ধনেপাতা, মিষ্টি কুমড়া, লাউ ও পেঁয়াজ চাষের জন্য এখানকার কৃষি শ্রমিকদের দৈনিক প্রায় ৭ ডলার (এক ডলার = ১২০ টাকা প্রায়) মজুরি দেওয়া হয়৷
কৃষক দিলীপ কুমার বিশ্বাস বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘‘এই ছায়া মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং গ্রীষ্মের তীব্র গরমের দিনে শ্রমিকদের জন্যও কাজ করা আরামদায়ক করে তোলে৷”
মানিকগঞ্জের পাইলট প্রকল্পটি পরিচালনা করছে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড (GIZ)। দারিদ্র্য ও জলবায়ু চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে চুয়াডাঙ্গাতেও একই ধরনের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হয়েছে৷ এইসব জমিতে আদা ও হলুদের মতো ছায়াসহিষ্ণু সবজির ভালো ফলন পাওয়া গেছে৷
চুয়াডাঙ্গার পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোতে ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনের বিষয়টিও যাচাই করা হয়েছে৷
বিআইজিডি -এর সহকারী অধ্যাপক রোহিনী কামাল জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কৃষকরা দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান চাষে বেশি আগ্রহী৷ এর জন্য প্রচুর সূর্যের আলো প্রয়োজন, তাই চলমান প্রকল্পটিতে সৌর প্যানেলের নিচে কীভাবে ধান চাষ করা যায় তার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে৷
তিনি আরও বলেন, মানিকগঞ্জের মতো নীচু এলাকায় বর্ষাকালে জমি তলিয়ে যায়৷ ফলে সেখানে বন্যাসহিষ্ণু ধানের জাত প্রয়োজন৷ পাশাপাশি সৌর প্যানেল স্থাপনের কাঠামোটি এমন মজবুত হতে হবে যাতে এসব এলাকায় মাঝেমধ্যে আঘাত হানা শক্তিশালী ঝড়ও মোকাবিলা করতে পারে৷
লাভ-ক্ষতির হিসাব কি মিলবে?
অ্যাগ্রিভোল্টাইক ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনকতা হবে, তা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে৷ সাধারণত মাটিতে স্থাপন করা প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তুলনায় কৃষিজমির ওপর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থাপনে খরচ বেশি৷ তবে চুয়াডাঙ্গায় ২০২৪ সালে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী ফসল ও বিদ্যুৎ— এই দুই খাত থেকে হওয়া আয় বিবেচনায় রাখলে সৌর প্যানেলের বিনিয়োগ তিন বছরে উঠে আসতে পারে৷
মানিকগঞ্জের এই প্রকল্পে কর্মরত কৃষিবিদ মেহেদি হাসান বাপ্পি জানান, কম উচ্চতার ও ঘনভাবে বসানো প্যানেল নির্মাণে খরচ কম হলেও এগুলোতে ছায়া বেশি পড়ে৷ অন্যদিকে, বেশি উচ্চতার ও ফাঁকা ফাঁকা কাঠামো তৈরিতে খরচ বেশি হলেও তা ধানসহ সূর্যের আলো বেশি লাগে এমন ফসলের জন্য অধিক উপযোগী হতে পারে৷
এখন পর্যন্ত ধানের ফলন ভালোই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাপ্পি৷ তবে এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে একাধিক মৌসুমের তথ্য প্রয়োজন হবে৷
এই প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মীদের দৈনিক মজুরি দেওয়া হয় এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিকটবর্তী কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়৷
রোহিনী কামাল মনে করেন, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হলে প্রকল্পটি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বাইরেও সরবরাহ করতে পারবে৷ তবে কৃষক বা পরিচালকরা যাতে তাদের জমিতে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের জন্য সরাসরি অর্থ পেতে পারেন, সেজন্য বিদ্যমান নিয়মকানুন পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি৷
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে ক্ষুদ্র পরিসরে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবস্থা স্থাপন করে থাকে এনজিও ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন৷ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান দীপল চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী যাতে এ ধরনের প্রকল্প থেকে উপকৃত হয় তা নিশ্চিত করতে হলে চুক্তিনামায় জমি ইজারা বা ভাড়ার শর্ত, অর্থ প্রদান এবং লভ্যাংশ বণ্টনের নীতিমালা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত৷
আপাতত গবেষকরা অপেক্ষায় আছেন৷ ফসলের ওপর স্থাপিত সোলার প্যানেলগুলো যে সম্ভাবনার আশা দেখিয়েছে, ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে তা বাস্তবে কতটা অর্জিত হয়, জানার অপেক্ষা৷
রোহিনী কামাল মনে করেন, এই মডেলটি সফল হলে পরবর্তী কঠিন পরীক্ষাটি হতে পারে কৃষিজমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রমটি আরো বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া৷ যাতে সৌরবিদ্যুৎ কোম্পানি, কৃষক, জমির মালিক এবং গ্রামীণ শ্রমিক- সবাই ন্যায্যভাবে এর সুফল ভাগ করে নিতে পারেন৷