দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া হাম প্রাদুর্ভাবে এক মাসে ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দেওয়ার পর জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। মৃতদের বেশিরভাগই শিশু এবং সাম্প্রতিক সময়ে এটিই হতে পারে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হাম প্রাদুর্ভাব।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চের পর থেকে দেশে ৭,৫০০-এর বেশি সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯০০টিরও বেশি নিশ্চিত করা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের (মাত্র ১২৫টি) তুলনায় অনেক বেশি।
রোববার শুরু হওয়া এই টিকাদান কর্মসূচি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দীর্ঘদিন ধরে চলা নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থার কিছু ঘাটতি সামনে চলে এসেছে।
এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফলোয়েরস বলেন, “টিকা শিশুদের বেঁচে থাকার ভিত্তি। বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব হাজার হাজার শিশুকে, বিশেষ করে সবচেয়ে ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণদের গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”
কেন বাড়ছে হাম রোগী?
প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। শিশুদের সাধারণত ৯ মাস বয়স থেকে হাম টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসের নিচে। এই শিশুদের এখনো নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।
বাংলাদেশে প্রতি চার বছর পরপর বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে আর কোনো বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি- প্রথমে কোভিড মহামারির কারণে, পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য।
২০২৪ সালে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পরও পরিকল্পিত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া টিকা সংগ্রহে জটিলতার কারণে সরবরাহ ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।
তবে ইউনিসেফ বলছে, এমন পরিস্থিতি সাধারণত একক কোনো কারণে নয় বরং দীর্ঘদিনের ছোট ছোট ঘাটতির ফলেই তৈরি হয়।

কী করছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় জরুরি হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৩০টি উপজেলায় কার্যক্রম চালানো হবে।
৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যারা নিয়মিত টিকা মিস করেছে এবং যারা গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া জনবহুল ঢাকা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী অধ্যুষিত কক্সবাজার এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, মানুষকে সচেতন করতে ইনফোগ্রাফিক ও তথ্য প্রচারও চালানো হচ্ছে।
হাম কী?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং গুরুতর জটিলতা এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
সাধারণ উপসর্গ:
উচ্চ জ্বর, চোখ লাল ও পানি পড়া, কাশি, হাঁচি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হাম রোগে মারা গেছে। যাদের বেশিরভাগই ৫ বছরের নিচের শিশু। এই রোগ প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বজুড়ে কী বাড়ছে হাম?
গত দুই দশকে বিশ্বে হাম রোগের সংখ্যা কমলেও, সাম্প্রতিক সময়ে আবার বাড়ার সতর্কতা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা ২০০০ সালের ৩ কোটি ৮০ লাখের তুলনায় কম হলেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে হাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। মহামারির পর টিকা নিয়ে সন্দেহ ও অনীহার কারণেও এই প্রবণতা বাড়ছে। উদাহরণ হিসেবে, ফেব্রুয়ারিতে উত্তর লন্ডনের কিছু স্কুলে হাম ছড়িয়ে পড়লে অভিভাবকদের আবারও শিশুদের টিকা দেওয়ার আহ্বান জানায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিবিসি থেকে অনুবাদিত