বাংলাদেশে এক সময় নির্বাচন ছিল উৎসবের মতো। মিছিল, মিটিং, প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি নির্বাচনী আমেজ থাকতো পাড়া-মহল্লায়, গ্রাম কিংবা শহর সর্বত্র। ভোটারা অধির আগ্রহ নিয়ে ভোটের দিনের অপেক্ষায় থাকতেন। অনেকেরই ধারণা এমন ভোট সর্বশেষ হয়েছে ২০০৮ সালে। পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর করা হয়েছে। মানুষ এখন আর নির্বাচনে আগ্রহ বোধ করেন না। মানুষের একটি ধারণা হয়েছে, নির্বাচনের ফল আগেই নির্ধারিত।
এই প্রতিবেদনটি লিখতে গিয়ে একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলা হয়। ভোটাররা মনে করছেন, আগের নির্বাচনের মতোই এবারও নির্বাচনী আমেজ কম। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করা হয়েছে নির্বাচনী আমেজ কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে। সেখান থেকেই এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ‘নির্বাচনী আমেজ কম’ হওয়ার ছয় কারণ-
১. ভোটাধিকার নিয়ে আস্থাহীনতা
বহু মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছে যে, ভোটের ফল বাস্তবে নির্বাচনের আগেই ঠিক হয়ে যায়। ফলে ভোট আর পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তারা মনে করছেন, ভোট দিলেও ফল বদলায় না। ভোটের ওপর বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ায় ভোট নিয়ে আগ্রহ কমেছে নাটকীয়ভাবে।
২. শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের অনুপস্থিতি
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে নির্বাচনে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষকে মাঠে থাকতে দেওয়া হয়নি। নির্বাচন অনেকটাই একপাক্ষিক হয়ে যায়। নির্বাচনের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমতে থাকে। এখনো নির্বাচনে কার্যত শক্তিশালী বিরোধী শক্তির অভাব বোধ করছেন ভোটাররা। শক্তিশালী বিরোধী জোট না থাকায় নির্বাচন অনেকের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। যদিও গত কয়েক বছরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক আগ্রহ বেড়েছে এবং তারা নির্বাচনেও আসছে।
৩। পোস্টার-ব্যানার-মাইকিং
নির্বাচনী আমেজ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে পোস্টার, ব্যানার এবং মাইকে প্রচার-প্রচারণা। তবে এবার নির্বাচনে এসব প্রচার-প্রচারণায় আগের চেয়ে বেশি বাধ্যবাধ্যকতা তৈরি করা হয়েছে। যে কারণে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ, উদ্দীপনায় ঘারতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া, পোস্টার, ব্যানার নির্বাচনী মাঠকে যেভাবে জমিয়ে রাখে বা উৎসবে পরিণত করে তা এবার দেখা যাচ্ছে না।
৪। জনগণের বড় অংশ রাজনীতি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন
জনগণের বড় অংশ রাজনীতি থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কারণ তারা দীর্ঘদিন ধরে কোনো বাস্তব পরিবর্তনের ফল দেখছে না। ভোট, আন্দোলন কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য- সবকিছুকেই এখন মানুষ একই ধরনের নাটক হিসেবে দেখে। এই অনাস্থা রাজনীতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ রাজনীতিকে ভবিষ্যৎ গড়ার মাধ্যম নয়, বরং হতাশার উৎস হিসেবে দেখছে। এর ফলেই নির্বাচনের মৌসুমি উত্তেজনা আর সমাজে গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারছে না।
৫। অর্থনৈতিক চাপ ও জীবিকার লড়াই
দাম বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সংকট, আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন রাজনীতির চেয়ে পেটের রাজনীতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। যে কারণে নির্বাচনের চেয়ে কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
৬। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, কিন্তু মাঠে নীরবতা
এবারই প্রথম পোস্টার, ব্যানার এবং মাইকিংয়ের পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুক-টুইটারে ছবি, ভিডিও ও লেখালেখির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতটা নির্বাচনী উত্তাপ ছড়াচ্ছে, মাঠ পর্যায়ে তা ছড়াচ্ছে না।