নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) ২৫৭ প্রকৌশলীর চাকরি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর, চাকরি নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিতে নানা অনিয়ম হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে পাশ কাটানো হয়েছে সব বিধিবিধান। আইনগত সুযোগ না থাকলেও দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি।
এসব প্রকৌশলীর নিয়োগ–পদোন্নতি নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। উচ্চপর্যায়ের এই তদন্ত কমিটি গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এলজিইডির প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর ও নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে। গত ৩ জুলাই প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়।
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ২০১০ সালে ১৩১ জন, ২০১১ সালে ১০৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১৭ জনকে এলজিইডির রাজস্ব খাতভুক্ত সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদে স্থানান্তর করা হয়। তদন্তে দেখা গেছে, রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি গ্রহণের আবশ্যকতা থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ২৫৭ প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে পিএসসিরও সুপারিশ নেওয়া হয়নি। নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও বিধি অনুসরণ না করেই এই প্রকৌশলীদের রাজস্ব খাতে পদায়ন ও নিয়মিত করা হয়।
কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূতাপেক্ষ তারিখে নিয়মিত করার সুযোগ না থাকায় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এই প্রকৌশলীদের নিয়মিতকরণের আদেশ জারির বিধিগত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুযায়ী, প্রকল্পের কোনো কর্মচারীকে ভূতাপেক্ষ তারিখ থেকে নিয়মিতকরণের সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি জড়িত থাকায় ভূতাপেক্ষ তারিখ হতে জ্যেষ্ঠতা গণনারও সুযোগ নেই।
তদন্ত কমিটির মতে, চাকরি নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা গণনার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। নিয়মিতকরণ যথাযথভাবে না হওয়ায় তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনা করারও সুযোগ নেই। এমনকি তাঁদের সপ্তম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেড দেওয়া ও ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না। তাঁদের যে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, সেটি আইনসম্মত হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অবস্থান নির্ধারণ না করে ২৫৭ প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এতে ২০০৮ সালের পরে পিএসসির মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ পাওয়া সহকারী প্রকৌশলীরা প্রাপ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চাকরি নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম হলেও এই প্রকৌশলীদের অনেকেই এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে আছেন। এমনকি প্রশাসনও তারা নিয়ন্ত্রণ রাখছেন। যেমন, এলজিইডির নিয়োগ ও পদায়ন শাখায় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম। এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, নিজের নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শফিকুল এখন অন্য প্রকৌশলীদের নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করছেন।
নিয়মিতকরণ বিধিমালা অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করতে হলে চাকরির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। ২৫৭ প্রকৌশলীকে রাজস্ব খাতভুক্ত করার প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ৩৬ জনের চাকরির ধারাবাহিকতা ছিল না। অর্থাৎ তাঁরা সে সময় কর্মরত ছিলেন না।
এলজিইডির নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী (পুর) পদের জন্য নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি। তদন্তে দেখা গেছে, রাজস্ব খাতে আসা এসব প্রকৌশলীর মধ্যে পাঁচজনের নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না।
চাকরির বিধিবিধান বিশেষজ্ঞ সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, এই সহকারী প্রকৌশলীদের চাকরি নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে, তা কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্ট। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।