বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে চলেছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ঘিরে আবারও সরব হয়েছে রাজনীতি, চাঙ্গা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং জাতীয় অঙ্গন।
ডাকসু মানেই ইতিহাস, নেতৃত্ব আর আন্দোলনের নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পেরোনো এই প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্ররাজনীতির উর্বর ভূমি হিসেবে গড়ে উঠেছে ডাকসু। আর সেই ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন অনেকেই পরবর্তীতে হয়েছেন জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি।
এক শতাব্দীর ইতিহাস ও গৌরব
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক বছর পর, ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে গঠিত হয় ডাকসু। প্রথম ভিপি হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। এরপর কেটে গেছে শত বছর, কিন্তু ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৩৭ বার। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশে হয়েছে মাত্র ৭ বার।
ডাকসুর নেতৃত্বে যারা ছিলেন:
১৯২৪-২৫ সালের জন্য ডাকসুর ভিপি মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং জিএস যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত নির্বাচিত হন। ১৯২৫-২৬ ডাকসুতে ভিপি নির্বাচিত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং জিএস এ কে মুখার্জি (ভারপ্রাপ্ত এ বি রুদ্র)।১৯২৭-২৮ জন্য জিএস হন বি কে অধিকারী। ১৯২৮-২৯ সালে এএম আজহারুল ইসলাম ভিপি এবং এস চক্রবর্তী জিএস নির্বাচিত হন। ১৯২৯-৩০ এর নির্বাচনে রমণী কান্ত ভট্টাচার্য ভিপি এবং কাজী রহমত আলী ও আতাউর রহমান জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৩২-৩৩ সালে ভবেশ চক্রবর্তী জিএস, ১৯৩৩-৩৪ ভবেশ চক্রবর্তী জিএস, ১৯৩৫-৩৬ এ এইচ এম এ কাদের জিএস, ১৯৩৬-৩৭ এ এইচ এম এ কাদের জিএস, ১৯৩৮-৩৯ আব্দুল আওয়াল খান জিএস, ১৯৪১-৪২ আব্দুর রহিম জিএস, ১৯৪৫-৪৬ আহমদুল কবির (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ) ভিপি এবং সুধীর দত্ত জিএস, ১৯৪৬-৪৭ ফরিদ আহমেদ ভিপি ও সুধীর দত্ত জিএস নির্বাচিত হন।
দেশভাগের সময়কালের অস্থির সময়ে ১৯৪৭-৪৮ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন অরবিন্দ বোস এবং জিএস নির্বাচিত হন গোলাম আযম, ১৯৫৩-৫৪ সালে এস. এ. বারী ভিপি এবং জুলমত আলী খান (ভারপ্রাপ্ত ফরিদ আহমেদ) জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৪-৫৫ সালে নিরোদ বিহারী নাগ ভিপি এবং জিএস আব্দুর রব চৌধুরী নির্বাচিত হন।১৯৫৫-৫৬ সালে নিরোদ বিহারী নাগ ভিপি এবং আব্দুর রব চৌধুরী জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৬-৫৭ সালে একরামুল হক ভিপি ও শাহ আলী হোসেন জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৭-৫৮ সালে বদরুল আলম ভিপি এবং ফজলী হোসেন জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৫৮-৫৯ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন আবুল হোসেন এবং জিএস নির্বাচিত হন এ টি এম মেহেদী।
১৯৫৯-৬০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি হন আমিনুল ইসলাম তুলা এবং আশরাফ উদ্দিন মকবুল (ছাত্র ইউনিয়ন) হন জিএস। ১৯৬০-৬১ সালে বেগম জাহানারা আক্তার ভিপি এবং অমূল্য কুমার জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬১-৬২ সালে এস এম রফিকুল হক ভিপি ও এনায়েতুর রহমান জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬২-৬৩ সালের ডাকসুতে শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ ভিপি ও কে এম ওবায়েদুর রহমান (ছাত্রলীগ) জিএস নির্বাচিত হন।১৯৬৩-৬৪ সালের ডাকসুতে রাশেদ খান মেনন (ছাত্র ইউনিয়ন) ভিপি ও মতিয়া চৌধুরী (ছাত্র ইউনিয়ন) জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৪-৬৫ সালের ডাকসুতে বোরহানউদ্দিন (ছাত্র ইউনিয়ন) ভিপি ও আসাফউদ্দৌলা জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৬-৬৭ সালে ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী (ছাত্রলীগ) ভিপি ও শফি আহমেদ জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৭-৬৮ সালের ডাকসুতে মাহফুজা খানম (ছাত্র ইউনিয়ন) ভিপি ও মোরশেদ আলী (ছাত্র ইউনিয়ন) জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৮-৬৯ সালে তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ) ভিপি এবং নাজিম কামরান চৌধুরী জিএস নির্বাচিত হন।
স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তের উত্তল সময়ের ডাকসু নির্বাচন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনে অর্থাৎ ১৯৭০-৭১ সালে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) হন আ স ম আবদুর রব (ছাত্রলীগ) এবং আব্দুল কুদ্দুস মাখন (ছাত্রলীগ) হন সাধারণ সম্পাদক (জিএস)। ১৯৭২-৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসন আমলে ডাকসুর ভিপি হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (ছাত্র ইউনিয়ন) ও জিএস হন মাহবুব জামান (ছাত্র ইউনিয়ন)। ১৯৭৯-৮০ সালের ডাকসুতে মাহমুদুর রহমান মান্না (জাসদ ছাত্রলীগ) ভিপি নির্বাচিত হন এবং আখতারুজ্জামান (বাসদ ছাত্রলীগ) নির্বাচিত হন জিএস। ১৯৮০-৮১ সালে মাহমুদুর রহমান মান্না (জাসদ ছাত্রলীগ) ও আখতারুজ্জামান (বাসদ ছাত্রলীগ) জিএস ছিলেন। ১৯৮২-৮৩ আখতারুজ্জামান (বাসদ ছাত্রলীগ) ভিপি ও জিয়া উদ্দীন আহমেদ বাবলু (বাসদ ছাত্রলীগ) জিএস ছিলেন। ১৯৮৯-৯০ এর ডাকসুতে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ (ছাত্রলীগ) ভিপি এবং মুশতাক হোসেন জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৯০-৯১ ডাকসুতে আমানউল্লাহ আমান ভিপি (পরবর্তীতে শহীদ উদ্দিন চৌধূরী এ্যানি ভারপ্রাপ্ত-১৯৯২) (ছাত্রদল) ও খায়রুল কবির খোকন (ছাত্রদল) জিএস নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৯-২০ সালের ডাকসু নির্বাচনে নুরুল হক নুর (সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ) ভিপি এবং গোলাম রব্বানী (ছাত্রলীগ) জিএস নির্বাচিত হন।