দীর্ঘ সময় ধরে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা হওয়ার কথা তুলে ধরে এর সঙ্গে ‘ভারতীয় যোগসাজশ’ থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা বলেছেন এ বিষয়ক জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান।
১৬ বছর আগের আলোচিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন রোববার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
এ হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে তদন্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরকে দুর্বল করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার কথা তুলে ধরেন ফজলুর রহমান, যিনি বিডিআরের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
“কথা হচ্ছে এই বাহিনীটাকে দুর্বল করার ও বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র ছিল।
”তখন ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে আর তৎকালীন সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল।”
সংবাদ সম্মেলনে পিলখানা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কারা জানতে চাইলে গত ডিসেম্বরে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রধান বলেন, “তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, তৎকালীন ডিজিএফআই এর প্রধান মেজর জেনারেল আকবর।
“বিডিআর কার্নেজটা হওয়ার পর সরকার তার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল এবং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল।”
প্রতিবেশী দেশ বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন প্রশ্নের জবাবে ফজলুর রহমান বলেন, “আমরা ভারতকে বুঝিয়েছি, যেখানে আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দলবলসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন।”
আরেক এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “জেনারেল মঈন তার বক্তব্যে বলেছেন, তিনি এখানে অ্যাকশন করলে ভারত এখানে হস্তক্ষেপ করত।”
পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দপ্তরে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
ওই ঘটনায় ভারতীয়দের ভূমিকা থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা তুলে ধরে কমিশন প্রধান বলেন, “ওই সময় ৯২১ জনের মতো ভারতীয় দেশে এসেছিল। তার মধ্যে ৬৭ জন ভারতীয়র হিসাব মিলছে না।”
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলা বিডিআর বিদ্রোহকে ঘিরে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মামলা ও বিচার কার্যক্রম চলে।
ক্ষমতার পালাবদলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই ঘটনা পুনঃতদন্তের দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ ডিসেম্বর জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে দেয় সরকার। প্রথমে তিন মাস সময় দেওয়া হলেও পরে সময় বাড়ানো হয়।
রোববার প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন কমিশনের সদস্যরা।
সেখানে জানানো হয়, কমিশন গঠনের ১১ মাসের মাথায় দেওয়া এই প্রতিবেদন তৈরি করতে ২৪৭ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এদের মধ্যে নিহত পরিবারের ১৪ সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তি ১০ জন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন উপদেষ্টা, সামরিক কর্মকর্তা ১৩০ জন, বেসামরিক কর্মকর্তা চারজন, পুলিশ কর্মকর্তা ২২ জন, বেসামরিক ব্যক্তি নয়জন, সাবেক ও বর্তমান বিডিআর বা বিজিবি সদস্য ২২ জন, কারাগারে থাকা ২৬ জন ও তিনজন সাংবাদিকের স্বাক্ষ্য বা জবানবন্দি নিয়েছে কমিশন। স্বাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বর্তমান সেনাপ্রধানেরও।
এক প্রশ্নের জবাবে কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, “এগুলো (পরিকল্পনা-ষড়যন্ত্র) দীর্ঘ সময় ধরে হয়েছে। এটা একদিনে হয়নি। যেমন তাপস (সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস) এসে বিভিন্ন সময় মিটিং করেছেন। সর্বশেষ দিনে এই কিলিংটা হয়েছে।”
কবে থেকে এই ষড়যন্ত্র চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০০৮ থেকে শুরু হয়েছে এটা বলতে পারেন। নির্বাচনের আগে থেকে শুরু হয়েছে।”
এ হত্যাকাণ্ডের কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক হল বিডিআর এর মধ্যে ডাল-ভাত কর্মসূচি নিয়ে ক্ষোভ ছিল। যার কারণে তাদের ডিউটি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিছু বিডিআর সদস্য সেনাবাহিনীর অফিসারদের এখানে তাচ্ছিল্য করত। বিডিআর এর মধ্যে অনেক রকম টানাপোড়েন ছিল। এই রকম অনেক কারণ ছিল।”
সেই সময় সাবেক মেয়র তাপসকে ‘হত্যাচেষ্টার’ অভিযোগে পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে গুম করার অভিযোগ উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে কমিশনপ্রধান বলেন, “তাদের গুম করা হয়নি। তাদের ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।”
এর আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বলা হয়, এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং এর পেছনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবুজ সংকেত রয়েছে। আওয়ামী লীগ দল হিসেবে সরাসরি ভূমিকা রাখে এবং সাবেক সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস ‘প্রধান সমন্বয়কের’ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে এতে ‘বহিঃশক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততার’ প্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তদন্ত কমিশনের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান এবং কমিশনের আরেক সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার এসব তথ্য দেন। পরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর তা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়।