রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর গ্রামের পাটখেতের পাশ থেকে সোমবার সকালে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আসাদুল ইসলাম (২২) নামের এক তরুণের দগ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সোমবার রাতে নিহত তরুণের বাবা থানায় হত্যা মামলা করেন।
হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে রাতেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, রড, রক্তমাখা হেলমেট আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পাওনা টাকা আদায়কে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
নিহত আসাদুল কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের বিলমানুষমারি গ্রামের কৃষক শাহজাহান মণ্ডলের ছেলে। তিনি বালিয়াকান্দি মীর মশাররফ হোসেন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মদাপুর গ্রামের মো. মিজান শেখ (২৪), মিজানের খালু ও পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের আনোয়ার মণ্ডল (৪০) ও সূর্যদিয়া গ্রামের আবদুল করিম মোল্লা (৩৫)।
আসাদুলের পরিবার জানায়, রোববার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসাদুল নিখোঁজ হন। তিনি রোববার রাত আটটার দিকে তাঁর সৌদিপ্রবাসী ভগ্নিপতির কাছে জরুরি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার টাকা চান। এর পর থেকে তাঁর ফোন বন্ধ ছিল। পরিবার তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। ওই রাতেই তাঁর পরিবার কালুখালী থানার পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পরদিন সোমবার সকালে উপজেলার মদাপুর এলাকার একটি পাটখেতের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচ থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আসাদুলের দগ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। পাওনা টাকা আদায় করতে আসাদুলকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। হত্যার আলামত নষ্ট করতে তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আসাদুলের বাবা শাহজাহান মণ্ডল বাদী হয়ে সোমবার রাতে কালুখালী থানায় অজ্ঞাত সাত থেকে আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর রাজবাড়ী জেলা শাখার আমির মো. নূরুল ইসলাম দাবি করেছেন, আসাদুল জামায়াতের মদাপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সোমবার রাত ১১টা পর্যন্ত তিনিসহ দলীয় কর্মীরা থানায় অবস্থান করেন। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
আদালতে আসামিদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (পাংশা সার্কেল) দেবব্রত সরকার বলেন, আসাদুল পরিবারের অভাব ঘোচাতে পড়াশোনার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে একমি কোম্পানিতে চাকরি নেন। সেখানে একই এলাকার পূর্বপরিচিত মিজান শেখের কাছ থেকে ৬৮ হাজার টাকা ধার নেন। ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধের কথা বলে টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে টাকা ফিরে পাওয়ার বিকল্প পথ বেছে নিয়ে মিজান কয়েকজন পেশাদার সন্ত্রাসী ভাড়া করেন।
আসামি মিজানের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, রোববার রাতে আসাদুলকে কৌশলে নির্জন এলাকায় ডেকে নিয়ে কিল-ঘুষি মেরে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। তাতে রাজি না হওয়ায় ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর হাত-পা বেঁধে শারীরিক নির্যাতন করে শ্বাসরোধে হত্যা করে। নির্যাতনের চিহ্ন মুছে ফেলতে তারা মোটরসাইকেল থেকে পেট্রল নিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রেপ্তার তিনজন আসাদুলকে মারধরের পরিকল্পনায় অংশ নিলেও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। হত্যায় সাত–আটজন জড়িত ছিল।
আসাদুলের চাচা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদুলের মতো ভালো ছেলে এলাকায় খুব কমই আছে। অথচ তাকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকের ফাঁসি চাই।’ তিনি জানান, ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে পুলিশ আসাদুলের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। সন্ধ্যার আগে তার নিজ গ্রামে দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, সোমবার রাতে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, লোহার রড ও রক্তমাখা হেলমেট আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে পুলিশ।