কোথাও ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারেননি, আবার কোথাও দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখতে। ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় দোকান খুলেও বিক্রি করতে পারেননি অনেকে।
রাতভর টানা বর্ষণ এবং রোববার সকাল থেকে অঝোর বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, নূরজাহান মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও কারওয়ান বাজারসহ বড় বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
কোথাও ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারেননি, আবার কোথাও দোকানের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রাখতে। ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় দোকান খুলেও বিক্রি করতে পারেননি অনেকে।
সরেজমিনে নিউমার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের প্রবেশপথ, নিচতলার দোকান, ফুটপাত ও আশপাশের সড়কে হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমেছে। অনেক দোকানের শাটার বন্ধ ছিল। ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা বেচাকেনার পরিবর্তে দোকানের ভেতরের পানি সরানো এবং মালামাল উঁচু স্থানে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন। মার্কেটের ভেতরের কয়েকটি খাবারের দোকানেও পানি ঢুকে পড়ে।
নিউমার্কেটের পোশাক ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ টিবিএসকে বলেন, রাতের বৃষ্টির পর সকালে দোকানে এসে তিনি ভেতরে পানি দেখতে পান। ফলে দোকান খোলার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
তিনি বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরেই কখনো দোকান খুলছি, কখনো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একদিন দোকান বন্ধ থাকলেই ১০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়। অথচ দোকানভাড়া, কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য খরচ তো বন্ধ থাকে না।”
একই মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী সজিব বলেন, বর্ষা এলেই নিউমার্কেটে পানি জমে। বছরের পর বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
“প্রতি বছর একই দৃশ্য দেখি। দোকান খুলতে পারি না, লোকসান গুনতে হয়। আমরা শুধু চাই, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক,” বলেন তিনি।
নিউমার্কেটের সব দোকান বন্ধ
জলাবদ্ধতার কারণে রোববার সকাল থেকে নিউমার্কেটের সব দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে জানান নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম।
তিনি বলেন, সোমবার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দোকানপাট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গাউছিয়া, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও নূরজাহান মার্কেটেও একই চিত্র দেখা গেছে। নিচতলার কয়েকটি দোকানে পানি ঢুকে কাপড় ও অন্যান্য পণ্য ভিজে যায়। ব্যবসায়ীরা জানান, দোকান খুললেও ক্রেতা না থাকায় তেমন বিক্রি হয়নি। ভেজা কাপড় শুকিয়ে বিক্রি করা গেলেও আগের দাম পাওয়া যায় না।
শুধু বড় দোকান নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে। দুপুর পর্যন্ত নিউমার্কেট এলাকার অধিকাংশ ফুটপাত প্রায় ফাঁকা ছিল। চায়ের দোকান, ফলের দোকান, ভাজাপোড়ার দোকান ও মুচির টংঘরসহ অনেক অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।
ফল বিক্রেতা মোরশেদ বলেন, ভোরে মালপত্র নিয়ে বের হলেও বৃষ্টির কারণে দোকান সাজাতে পারেননি। দুপুর পর্যন্ত একটি ফলও বিক্রি হয়নি। প্রতিদিনের আয়ের ওপরই তার সংসার চলে।
মুচি ঋত্বিক কর্মকার বলেন, বৃষ্টির দিনে মানুষ কম বের হওয়ায় কাজও থাকে না। সকাল থেকে বসে থাকলেও তার কোনো আয় হয়নি। অথচ পরিবারের খরচ, বাসাভাড়া ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারে বিক্রিতে ধস
সরেজমিনে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, দুপুরের পরও অনেক জায়গা থেকে পানি পুরোপুরি নামেনি। বাজারের বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা থাকায় ক্রেতা ও শ্রমিকদের কাদাপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে।
নিচু জায়গাগুলোতে পানি জমে থাকায় পণ্য পরিবহন ও দোকান পরিচালনায় ভোগান্তিতে পড়েন ব্যবসায়ীরা। অনেক দোকানের সামনে কাদা ও জমে থাকা পানির কারণে স্বাভাবিক কেনাবেচাও ব্যাহত হয়।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল বলেন, “প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ১০টার মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি হয়। কিন্তু আজ দুপুর পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকারও বিক্রি হয়নি।”
তিনি বলেন, বাজারে পানি ঢুকে কয়েক বস্তা পুঁইশাক, ধনেপাতা, লালশাক ও কাঁচা মরিচ ভিজে গেছে। এগুলো আর আগের দামে বিক্রি করা যাবে না। কিছু পণ্য ফেলে দিতেও হতে পারে।
সবজি ব্যবসায়ী আব্দুর লতিফ বলেন, “ভোরে ট্রাক থেকে মাল নামানোর পরই বৃষ্টির পানি বাজারে ঢুকে পড়ে। প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার টমেটো, বেগুন, শসা ও পাতাজাতীয় সবজি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।”
তিনি বলেন, ভেজা সবজি বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায় না। তাই কম দামে বিক্রি করতে হবে। একদিকে বিক্রি কম, অন্যদিকে মালামাল নষ্ট হচ্ছে—দুই দিক থেকেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।