কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো সম্প্রসারণে ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এয়ারট্রাঙ্ক। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা রবিন খুদার নেতৃত্বে নেওয়া এ উদ্যোগ নতুন করে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্ল্যাকস্টোনের সমর্থনপুষ্ট ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাঙ্ক ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩ লাখ কোটি রুপি) বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ৫ গিগাওয়াটেরও বেশি ডাটা সেন্টার সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া এ উদ্যোগ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হাইপারস্কেল অপারেটরটিকে ভারতের দ্রুত বিস্তৃত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসবে।
এই বৃহৎ সম্প্রসারণ কর্মসূচির নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় উদ্যোক্তা রবিন খুদা। তাঁর দ্রুত উত্থান ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ব্যবসায়িক অঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
২০২৩ সালে দ্য অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ–এর ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হওয়া রবিন খুদা স্বনির্মিত বিলিয়নিয়ার। ডাটা সেন্টার নির্মাণ ব্যবসার মাধ্যমে তিনি তাঁর সম্পদের বড় অংশ গড়ে তুলেছেন। ফোর্বস–এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার।
ব্ল্যাকস্টোন ও কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের সমর্থনপুষ্ট এই বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বর্তমানে ভারতে বিবেচনাধীন সবচেয়ে বড় ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ভারতের আদানি গ্রুপও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ডাটা সেন্টার নির্মাণে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।
এয়ারট্রাঙ্ক জানিয়েছে, প্রকল্পটি ভারতের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বাস্তবায়িত হবে এবং ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে লুমিনা ক্লাউডইনফ্রা অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করে এয়ারট্রাঙ্ক। ওই চুক্তির ফলে মুম্বাই, চেন্নাই ও হায়দরাবাদে প্রতিষ্ঠানটি ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ডাটা সেন্টার উন্নয়ন পাইপলাইন হাতে পায়।
এরই মধ্যে মহারাষ্ট্রে প্রকল্পটির ব্যাপ্তি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ জানান, রায়গড় পেন গ্রোথ সেন্টারে ৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডাটা সেন্টার প্রকল্পের জন্য জমি বরাদ্দসংক্রান্ত একটি অভিপ্রায়পত্র বিনিময় হয়েছে। প্রায় ২ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগের এ প্রকল্পটি ভারতের অন্যতম বৃহৎ ডাটা সেন্টার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকায় জন্ম, বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টার সাম্রাজ্য
রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ১৯৯৭ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এবং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন এবং পেশাগত হিসাববিজ্ঞানের বিভিন্ন সনদ অর্জন করেন।
প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে কর্মজীবন শুরু করা খুদা ফুজিৎসু অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পাইপ নেটওয়ার্কসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত পরিকল্পনা, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে তিনি ডাটা সেন্টার কোম্পানি নেক্সটডিসিতে যোগ দেন, যেখানে খাতটিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করেছিল।
২০১৫ সালে তিনি এয়ারট্রাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুর সময়টা সহজ ছিল না। বিনিয়োগ সংগ্রহে জটিলতার কারণে তাঁকে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ও ব্যবহার করতে হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের মধ্যে সিডনি ও মেলবোর্নে বড় আকারের ডাটা সেন্টার ক্যাম্পাস চালু করতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৪ সালে ব্ল্যাকস্টোনের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম ২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে এয়ারট্রাঙ্ক অধিগ্রহণ করে। তবে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে বহাল থাকেন রবিন খুদা।
বর্তমানে এয়ারট্রাঙ্ক নিজেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পরিচালিত একটি হাইপারস্কেল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দেয়। অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের হিউমেইনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যেও সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
কেন এখন ভারতের দিকে ঝুঁকছে এয়ারট্রাঙ্ক
এয়ারট্রাঙ্কের মতে, ডাটা সেন্টার শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি উপাদান—বাজার চাহিদা, দক্ষ জনশক্তি এবং নীতিগত সহায়তা—ভারতে বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠানটি ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’, ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’ এবং ‘ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন’-কে তাদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রবিন খুদার ভাষায়, বিনিয়োগযোগ্য মূলধন সবসময়ই চলমান। যেসব দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা দেখাতে পারে, তারাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো বিনিয়োগের পরবর্তী ঢেউ নিজেদের দিকে টেনে নিতে পারবে। তাঁর মতে, ভারত সে দিকেই এগোচ্ছে।
বিনিয়োগ ঘোষণার পর পানি ব্যবহারের উদ্বেগ
এয়ারট্রাঙ্কের ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো খাতের দ্রুত অগ্রগতির প্রশংসা করেন।
তবে অনেক ব্যবহারকারী এ ঘোষণার সমালোচনাও করেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ঠিক পরদিন পানি ও বিদ্যুৎনির্ভর ডাটা সেন্টার প্রকল্প উদযাপন করাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন।
চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত কাউন্সিল অন এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াটার (সিইইডব্লিউ)-এর এক গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪ সালে ভারতের ডাটা সেন্টারগুলো প্রায় ১৫০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন লিটারেরও বেশি হতে পারে, যা দেশটির ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশগত স্থায়িত্বের বিষয়টিও আগামী বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।