দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সামাল দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে প্রতিদিনই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ছে। বিদ্যমান শয্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। দুর্ঘটনা ছাড়াও নানা অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর রোগী বাড়তে শুরু করায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজার ৬০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকছেন। হাসপাতালটির চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অনেককেই দীর্ঘ সময় হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ৭২৯ জন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩৯ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। তবে এক সপ্তাহে ডেঙ্গুতে কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। কারণ, এসব এলাকায় এডিস মশার বিস্তার বেড়েছে। গত বছরও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বরগুনা জেলায় ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছিল। সে সময় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করলেও সেগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
আইইডিসিআরের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. গোলাম ছারোয়ার বলেন, দেশজুড়ে এডিস মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, এ বছর গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হতে পারে এবং কার্যকর মশক নিধন ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রাক-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার প্রজনন সূচক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত উচ্চ ঝুঁকির সীমার অনেক ওপরে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে সেখানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাক হোসেনও গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একই ধরনের পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মদ মইনুল আহাসান জানান, দেশব্যাপী ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এডিস মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।