1. [email protected] : মো: সরোয়ার সরদার : মো: সরোয়ার সরদার
  2. [email protected] : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক
  3. [email protected] : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি
  4. [email protected] : Sadak Mostafa : Sadak Mostafa
  5. [email protected] : বিশেষ প্রতিনিধি : বিশেষ প্রতিনিধি
  6. [email protected] : Yousuf Mahmud : Yousuf Mahmud
পোলট্রি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিক নির্ভরতা বাড়ছে | ঢাকা আওয়ার
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:

পোলট্রি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিক নির্ভরতা বাড়ছে

ঢাকা আওয়ার ডেস্ক
  • শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

পোলট্রিশিল্প দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রতিদিন কোটি মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা মুরগির মাংস ও ডিমের জোগান দিচ্ছে এই খাত।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে পোলট্রিশিল্পের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে উৎপাদনের এই সাফল্যের আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ঝুঁকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এএমআরকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একটা সময় মানুষের সাধারণ সংক্রমণেও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ও পাবলিক হেলথ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কে বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পোলট্রি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। অনেক খামারির বায়োসিকিউরিটি প্রশিক্ষণ ও ভেটেরিনারি পরামর্শের অভাব রয়েছে। মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণী খাতে ব্যবহার হওয়ায় এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে প্রতিরোধ ক্ষমতা স্থানান্তরের ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ওয়ান হেলথভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ, খামারিদের প্রশিক্ষণ এবং শিল্প ও হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।’

খামারে ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক : বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাণিজ্যিক পোলট্রি খামারগুলোয় অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত জার্নাল নেচার সাময়িকীতে গত বছর প্রকাশিত গবেষণাটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও কক্সবাজার জেলার ৩৪০টি বাণিজ্যিক খামারে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ছিল ১০৯টি ব্রয়লার, ১০৯টি লেয়ার এবং ১২২টি সোনালি মুরগির খামার।

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ৯৩.২ শতাংশ খামারে উৎপাদন চক্রের কোনো না কোনো পর্যায়ে অন্তত একটি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে।

আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তথ্য সংগ্রহের আগের ১৪ দিনের মধ্যে ৬৭ শতাংশ খামারি তাঁদের মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক খাইয়েছেন।
ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার খামারের তুলনায় মাংস উৎপাদনকারী খামারগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। গবেষণা অনুযায়ী, লেয়ার খামারের ৪১.৩ শতাংশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হলেও ব্রয়লার খামারে এ হার ৭৮ শতাংশ এবং সোনালি খামারে ৬৭.২ শতাংশ।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, মানুষের চিকিৎসায় শেষ পর্যায়ের কার্যকর ওষুধ হিসেবে বিবেচিত কোলিস্টিনও পোলট্রি খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের জন্য সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক প্রাণী খাতে ব্যবহার ভবিষ্যতের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।

অজ্ঞতা ও দুর্বল তদারকি : গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের পেছনে খামারিদের অজ্ঞতা ও দুর্বল তদারকি বড় কারণ। মাত্র ৩১.৫ শতাংশ খামারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে জানেন। বেশির ভাগ খামারির ধারণা, মুরগির যেকোনো অসুস্থতায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যায়।

অন্যদিকে মাত্র ২২ শতাংশ খামারি নিয়মিত লাইসেন্সধারী পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। প্রায় ৩০ শতাংশ খামারি কখনো ভেটেরিনারিয়ানের কাছে যান না।

খামারে ছড়িয়ে পড়ছে বহু ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু : অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রভাব পড়ছে খামারের জীবাণুগুলোর ওপর। তারা ধীরে ধীরে প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. কে বি এম সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় ঢাকার ৫০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১০টি উপশহরীয় এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি বাণিজ্যিক খামারের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার জন্য ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির অন্ত্রের সিকাম থেকে ১০০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

বিশ্লেষণে মোট ২৭০টি ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ই-কোলাই, যার হার ৫৫.৯ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সালমোনেলা, যার হার ১৬.৭ শতাংশ।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, অ্যামক্সিসিলিনের বিরুদ্ধে ৯৩.৩ শতাংশ জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। স্ট্রেপ্টোমাইসিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার ৫২.৬ শতাংশ এবং টেট্রাসাইক্লিনের বিরুদ্ধে ৪৬.৩ শতাংশ।

ভোক্তার খাবারের প্লেটেও প্রভাব : খামারের গণ্ডি পেরিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব এখন পৌঁছে গেছে ভোক্তার খাবারের প্লেটেও। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি ও টক্সিকোলজি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত পৃথক এক গবেষণায় রাজধানীর বাজারগুলোয় বিক্রি হওয়া মুরগির মাংস ও অঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।

শেরেবাংলানগর এলাকার ৯টি বাজার থেকে ১৪৪টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ছিল বুকের মাংস, রানের মাংস, কলিজা ও কিডনি। গবেষণায় দেখা গেছে, মোট নমুনার ১৫.২৮ শতাংশে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে বুকের মাংসে, যেখানে ১৯.৪৪ শতাংশ নমুনা দূষিত ছিল। কলিজায় এই হার ১৬.৬৭ শতাংশ, কিডনিতে ১৩.৮৯ শতাংশ এবং রানের মাংসে ১১.১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও অক্সিটেট্রাসাইক্লিন। কিছু নমুনায় লেভোফ্লক্সাসিনও শনাক্ত হয়েছে।

ঝুঁকিটা কোথায় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মুরগি বাজারজাত না করার যে নিয়ম রয়েছে, যাকে উইথড্রয়াল পিরিয়ড বলা হয়, সেটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানা হয় না। ফলে ওষুধের অবশিষ্টাংশ মুরগির শরীরে থেকে যায় এবং সেই মাংস ও ডিম মানুষের খাদ্যতালিকায় চলে আসে।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. পরিতোষ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এনিম্যাল খাতে আগের তুলনায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কিছুটা কমেছে। তবে এ বিষয়ে আরো সচেতনতা প্রয়োজন। সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে প্রয়োজন ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে উপযুক্ত ও নিরাপদ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুরগি বাজারজাত করার অন্তত ১৪ দিন আগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে।’

খামারিরা যা বলছেন : চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘যারা দীর্ঘ সময় ধরে মুরগি পালন করে, তাদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। তবে কম সময়ের বাচ্চা উৎপাদনকারী খামারগুলোয় এই প্রবণতা তুলনামূলক কম।’

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ এবং এভিস অ্যাগ্রোর প্রধান মোস্তফা জাহান বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে মুরগির বৃদ্ধি কমে যায়। তাই বর্তমানে আমি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করি না। মুরগি অসুস্থ হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।’

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহীন আলম বলেন, ‘আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে হবে। নিবন্ধিত পশু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।’

শেয়ার করুন

এই বিষয়ের আরও সংবাদ