দেশের আর্থিক লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তুলতে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক ক্যাম্পেইন’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ড. হাবিবুর রহমান বলেন, নগদ লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তুলতেই বাংলা কিউআর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা কোনো ধরনের খুচরা টাকা বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝামেলা ছাড়াই নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে লেনদেন হবে আরও সহজ, নিরাপদ ও সুরক্ষিত।
তিনি বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে সব লেনদেন নথিভুক্ত হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমবে। এতে দেশের জিডিপির আকার বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। পাশাপাশি যত বেশি মানুষ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে, দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী হবে।
ডেপুটি গভর্নর ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের নিজস্ব অ্যাপসে বাংলা কিউআর সুবিধা সংযুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও সহজে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ বলেন, বাংলা কিউআর চালুর ফলে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়বে, কারণ অধিকাংশ লেনদেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও গতি আসবে।
তিনি জানান, আগামী বছর দেশে একটি ইন্টারঅপারেবল ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইপিএস) চালু করা হবে। এর মাধ্যমে যে কোনো মোবাইল ওয়ালেট থেকে ব্যাংক হিসাব কিংবা ব্যাংক হিসাব থেকে মোবাইল ওয়ালেটে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে।
কবির আহমেদ বলেন, আর্থিক খাতে সংযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কম খরচে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা বা পারিবারিক প্রয়োজনে দ্রুত অর্থ পাঠানো সহজ হবে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভোগান্তি কমাবে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের প্রতিটি ধাপের একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল ট্রেইল বা ফুটপ্রিন্ট থাকে। ফলে অর্থের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ সহজ হবে এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত বিশেষ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার। অনুষ্ঠানে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিনসহ বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ‘বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক ক্যাম্পেইন’-এর মূল লক্ষ্য হলো দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থার কার্যকারিতা সরাসরি প্রদর্শন এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিউনিকেশনস অ্যান্ড পাবলিকেশনস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে আয়োজিত এ ক্যাম্পেইনে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি এফএমসিজি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। ব্যাংক প্রাঙ্গণে স্থাপিত অস্থায়ী স্টলগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাংলা কিউআর স্ক্যান করে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইউনিলিভার বাংলাদেশ, আগোরা (রহিম আফরোজ), মীনা বাজার, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন), ইউনিমার্ট, সেভয় আইসক্রিম, আরএফএল গ্রুপ এবং এমআর. ডিআইওয়াই।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস ব্যবস্থার আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।