1. [email protected] : মো: সরোয়ার সরদার : মো: সরোয়ার সরদার
  2. [email protected] : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক : ঢাকা আওয়ার ডেস্ক
  3. [email protected] : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি : আসিফ অনিক, খুবি প্রতিনিধি
  4. [email protected] : Sadak Mostafa : Sadak Mostafa
  5. [email protected] : বিশেষ প্রতিনিধি : বিশেষ প্রতিনিধি
  6. [email protected] : Yousuf Mahmud : Yousuf Mahmud
খুলনায় পার্লারের আড়ালে দেহ ব্যবসার অভিযোগ | ঢাকা আওয়ার
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পূর্বাহ্ন

খুলনায় পার্লারের আড়ালে দেহ ব্যবসার অভিযোগ

প্রতিবেদকের নাম
  • সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

খুলনার তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সের স্বত্বাধিকারী তানিয়া ইসলাম পার্লারের আড়ালে নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন; এমন অভিযোগ করছে ভূক্তভোগী ও পার্লারে কাজ করা একাধিক নারী। এছাড়া কর্মচারিদের বেতন আটকে রাখা, ভেজাল ও নকল প্রসাধনী ব্যবহার ও বিক্রি, নিয়ম বহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান, দেহ ব্যবসার মতো গুরুত্বর অভিযোগ রয়েছে তানিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে। এছাড়া, খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানেও পার্লারের আড়ালে দেহ ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ আছে তানিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে।

এর আগে, তানিয়া বিউটি পার্লারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া নানা অভিযোগে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় তানিয়া ইসলামের নামে হয়েছে তিনটি সাধারণ ডাইরি (জিডি)।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় ক্যাসেল সালাম পার্লারের সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন তানিয়া। অল্প দিনের ব্যবধানে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান। কিন্তু এত অর্থ সম্পদ অর্জনের বৈধ কোনো সূত্রে খুঁজে পান না স্থানীয়রা।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন কর্মচারী বলছে, তানিয়া বিউটি পার্লারের অভ্যন্তরে চলে অসামাজিক কর্মকাণ্ড। দিনের আলোতে রুপসজ্জা ও রুপচর্চা চললেও রাতে চলে অনৈতিক কাজ। রুপচর্চার কাজে নিয়োজিত নারী কর্মচারীদেরকে বাধ্য করা হয় এ সকল কাজে। রাত বাড়ার সাথে সাথে দিনের পার্লার হয়ে ওঠে রাতের রংমহল। তানিয়ার এই রঙ্গমঞ্চে সরকারি ঊচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তাদের যাওয়া আসা আছে।

অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও তানিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। সম্প্রতি তানিয়ার তিন জন কর্মচারী সোনাডাঙ্গা থানায় তানিয়ার বিরুদ্ধে জিডি করেন। জিডিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ নানা অনিয়মের ফিরিস্তি উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে দেহব্যবসা, কর্মীদের বেতন আটকে রাখা, ভেজাল ও নকল প্রসাধনী ব্যবহার ও বিক্রি, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদানসহ নানা বিষয় জিডিতে উল্লেখ করেন ওই তিন কর্মচারী।

মিথিলা (ছদ্মনাম) নামের একজন কর্মচারী জিডিতে উল্লেখ করেন, ‘২০২০ সালে কথিত বিউটিশিয়ান তানিয়ার নিকট রুপচর্চার প্রশিক্ষনের উদ্দেশ্যে যান তিনি। কোর্সশেষে বিউটিশিয়ান কোর্স’র সার্টিফিকেট প্রদান করার শর্তে তানিয়া ৭০ হাজার টাকা নেন। ভুক্তভোগীকে পার্লারের কাজের পাশাপাশি শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। তবে ৩ বছর অতিক্রম হলেও সার্টিফিকেট না দিয়ে তালবাহানা শুরু করে তানিয়া। এক পর্যায়ে সে অধিক অর্থ ইনকামের লোভ দেখিয়ে দেহ ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয় মিথিলাকে। সার্টিফিকেট প্রদানে অসম্মতিজ্ঞাপন করায় কোর্সের ৭০ হাজার টাকা ও বকেয়া বেতন চায় মিথিলা। একপর্যায়ে টাকা না দিয়ে উল্টো মিথিলার উপর বিভিন্ন অভিযোগ আনে তানিয়া।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী পৃথক জিডিতে উল্লেখ করেন, ‘নিরালা এসওএস স্কুল সংলগ্ন তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন তিনি। পূর্বে তানিয়ার ক্যাসেল সালামের পার্লারেও কাজ করতেন। অতিরিক্ত লাভের আশায় কাস্টমারকে ভেজাল, নকল ও নিন্মমানের প্রসাধনী প্রদান করতেন তানিয়া। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হওয়ায় খুলনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর নিরালার পার্লারে অভিযান চালায়। নকল পন্যসহ নানা অনিয়ম পাওয়ায় জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত। অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তানিয়া কর্মচারীদের কয়েক মাসের বকেয়া বেতন আটকে দেয়। যার কারণে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।’

পার্লারটির সাবেক কর্মচারী সুফিয়া সাথী (ছদ্মনাম) জানান, ‘সাথী উক্ত শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে ৮ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করেন। বিক্রয়কর্মী হিসেবে যোগদান করলেও তাকে দিয়ে ব্যাক্তিগত ও সাংসারিক কাজ করায় তানিয়া। তানিয়ার স্বামী ইমরান শিকদার বহুনারীতে আসক্ত ছিলেন। স্বামীর দ্বিতীয় বউ থাকায় এবং বাইরের নারীদের সঙ্গ এড়ানোর উদ্দেশ্যে সাথীকে সর্বদা সেজেগুজে থাকতে বলতেন তানিয়া।’

সাথী বলেন, ‘পার্লারে অনৈতিক কার্যক্রমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি ছাড়তে হয়। অন্যান্য কর্মীদের মত আমারও ২ মাসের ১৬ হাজার টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের কারণে আমার টাকা আটকে দিয়েছে।’

অভিযোগ আছে, তানিয়ার স্বামী ইমরানের লোলুপ দৃষ্টির স্বীকার হয়েছেন সাথীসহ আরও অনেক নারী। স্বামীর এ সকল ঘটনায় সাহায্য করতেন তানিয়া। এ বিষয়ে একাধিকবার তানিয়ার কাছে অভিযোগ দিয়ে কোনো লাভ হয়নি বলে জানান আরেক ভূক্তভোগী।

পার্লারের অসমাজিক কাজ নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তানিয়ার স্বামী ইমরান লেখেন, ‘পার্লার ও শপিং মলের নামে এখানে প্রতিনিয়ত চলে অবৈধ কাজ। পার্লারটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় অসামাজিক কর্মের জন্য আসা কাস্টমারদের প্রবেশে সমস্যা হয়না। প্রশাসনও তাদের হাতের নাগালে।’

ইমরানের ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসে আরও জানানো হয়, ‘এলাকাবাসী কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারলেও সমস্যা নেই। পারিবারিক সাপোর্টে এসকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দিনে পার্লারসহ অন্য ব্যবসা চালালেও, রাতে প্রতিনিয়তই জমজমাট হয় এই অবৈধ ব্যবসা।’ যদিও স্বামীর এ স্ট্যাটাসের কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন তানিয়া।

প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এক নারী জানান, উৎসবের দিনে বিশেষ কাপড়ে সারারাত চলে অসামাজিক কর্মকাণ্ড। নেশাজাত পানীয়সহ নানা আয়োজন থাকে পার্লারে। বাইরের বেশ কয়েকজন এসে নেশাজাত পানীয় পান করে। পার্লারে কর্মরত মেয়েদেরকে ছোট কাপড় পরে তৈরী থাকতে বলা হয়।

এছাড়া পার্লার দু’টির বিরুদ্ধে সাধারণ ভোক্তাদেরও আছে নানা অভিযোগ। নিম্ন মানের প্রসাধনী ও মেয়াদোত্তীর্ন পন্য ব্যবহার করায় অনেকের ত্বকেই দেখা দিয়েছে চর্মরোগসহ নানা রোগ। ত্বকে এসব নকল ও ভেজাল ক্রীম ও ঔষধ প্রয়োগের কারণে এলার্জিজনিত রোগেও ভুগছেন অনেকেই।

তারিনা হক নামক এক নারী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্রণের সমস্যা। এই পর্যন্ত অনেক টাকা খরচ করেছি এই পার্লারে। ব্রণ কমেনি বরং আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’

এছাড়া একাধিক নারী জানান, ‘ত্বক উজ্জল ও মসৃণকারী ক্রিমগুলো অতিরিক্ত দাম নেওয়া হয়। হাইড্রো ফেশিয়াল, নরমাল ফেশিয়াল, পেডিকিউর, মেনিকিউর, ওয়াক্সিং, পিলিং সহ ত্বকে ব্যবহৃত সকল প্রসাধনীর দাম কয়েকগুণ বেশি নেওয়া হয়।’

সুমি ইসলাম নামক এক নারী বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে আমি তানিয়া আপার কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য নিয়েছি। ক’দিন আগে অনলাইনে যাচাই করে দেখলাম দ্বিগুণেরও বেশি দাম নিয়েছে আমার থেকে। এ সকল বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’

এদিকে তানিয়ার নিকট ত্বকের চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী অসুস্থতায় ভুগছেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ত্বকে প্রসাধনী সামগ্রীর ভুল প্রয়োগ করায় অসুস্থতায় দিন পার করছি। শরীরের সংবেদনশীল স্থানে ভুল প্রসাধনী প্রয়োগ করায় ত্বকের বিভিন্নস্থান ঝলসে গেছে। যে কারণে ঘর থেকে বের হতে পারিনা আমি। ত্বক পূর্বের ন্যায় করার জন্য চিকিৎসা চলাচ্ছি।’

অভিযোগ আছে, কোনো ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন না করেই নিজেকে বিউটিশিয়ান দাবি করেন পার্লার দু’টির মালিক তানিয়া। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সার্টিফিকেট না থাকলেও অন্যকে বিউটি এক্সপার্ট বানানোর দ্বায়িত্ব নেন তানিয়া। তার কাছে কাজ শিখতে গেলেও গুনতে হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কাজ শেখা শেষে সার্টিফিকেট দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করলেও সার্টিফিকেট নিয়েও আছে নানা অভিযোগ।

একাধিক সূত্র বলছে, খুলনার অন্যান্য পার্লারে বিভিন্ন সাজ ও রুপচর্চার মুল্য নির্ধারণ কার্ড থাকলেও তানিয়ার পার্লার দু’টিতে মূল্য তালিকা থাকে না। এতে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন সাধারণ ভোক্তারা।

ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি তানিয়া বিউটিপার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানটি পরিচালনা করেন খুলনার উপ-পরিচালক দিলারা জামান। এ সময় বিপুল পরিমাণে ভেজাল, নকল, মেয়াদোত্তীর্ন পন্য পাওয়ায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় বিউটিশিয়ান হিসেবে তানিয়া নিজের কোনো সার্টিফিকেট দেখাতে পারেননি।

অভিযোগের বিষয়ে তানিয়া ইসলামরে কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিছু মানুষ আমার ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এ সকল তথ্য সব ভিত্তিহীন।

এছাড়া ত্বকের সমস্যায় ভোগা বিভিন্ন নারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গায়ের রং কালো থেকে উজ্জল করতে হলে এধরনের সমস্যা একটু হয়। আমি আমার কাস্টমারদেরকে জানিয়েই মেডিসিন প্রয়োগ করি।’

এ সকল অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমতাজুল হক বলেন, ‘তানিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। প্রসিকিউশনের জন্য জিডির কপি আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী সার্বিক বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

শেয়ার করুন

এই বিষয়ের আরও সংবাদ