ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও ইরানি মুদ্রা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়নের ফলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। খারাপ হতে থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে দেশের বহু ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ রেখে জাতীয় ধর্মঘটে অংশ নেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার বলেছেন, চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ‘বিক্ষোভ’ বলা যায় না; বরং এটি একটি ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধ’।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,
“এখন যা ঘটছে তা বিক্ষোভ নয়, এটি দেশের বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসী যুদ্ধ।”
তিনি দাবি করেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে পাঠানো ভয়েস মেসেজের অডিও রেকর্ড সরকারের কাছে রয়েছে।
আরাগচির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠী সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন ও দোকানেও হামলা চালিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের কাছে এমন ছবিও রয়েছে যেখানে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অস্ত্র বিতরণের দৃশ্য দেখা যায়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট রোববার বলেছেন, তার সরকার দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গত মাসে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পর এটি তার প্রথম বক্তব্য।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি তথাকথিত ‘দাঙ্গাকারীদের’ বিরুদ্ধে ‘নির্ণায়ক ব্যবস্থা’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
গত ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সারা দেশে ইন্টারনেট ও ফোন সেবা বন্ধ থাকায় বড় অংশের জনগণ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। লন্ডনভিত্তিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, দেশের ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে।
তেহরানের উপকণ্ঠে সংঘর্ষে একজন ইরানি পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যা উভয় পক্ষের প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি কোনো হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৪৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বিক্ষোভকারীরা রয়েছেন। আহত হয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ।
এইচআরএএনএ আরও জানায়, দেশের ৩১টি প্রদেশের ১৮৬টি শহরে ছড়িয়ে পড়া ৫৮৫টি স্থানে বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ১০ হাজার ৬৮১ জনকে আটক করা হয়েছে।
সরকারের সতর্কবার্তা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিদেশিদের সঙ্গে ‘যোগসাজশ’-এর অভিযোগ তুলে কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
ইরানি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তারা বিশেষ করে তেহরানে ক্রমবর্ধমান সহিংস বিক্ষোভকে সমর্থন দিচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনে সেখানে সশস্ত্র বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন, ব্যাংক, বাস ও মসজিদে অগ্নিসংযোগ করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব
অস্ট্রেলিয়া তাদের নাগরিকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইরান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার আবারও তেহরানকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানকে “কঠোরভাবে আঘাত” করা হবে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার রোববার সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তেহরানে সামরিক হামলা চালায়, তবে ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও শিপিং সেন্টারগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রা ধসজনিত ক্ষোভ থেকে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়, যা এখন বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি