লাতিন আমেরিকার রাজনীতির এক উত্তাল অধ্যায়ের সাক্ষী হলো বিশ্ব। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা পানামার ম্যানুয়েল নোরিয়েগার পর এবার একই তালিকায় যুক্ত হলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে বিশ্ব রাজনীতি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় “ব্যাপক মাত্রার” হামলার মধ্য দিয়ে তারা মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করেছে।
নিখোঁজ মাদুরো: উদ্বিগ্ন কারাকাস
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক অডিও বার্তায় জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের কাছে মাদুরো এবং তার স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। মাদুরো দম্পতি জীবিত আছেন কি না, তার প্রমাণ দাবি করেছে কারাকাস। ক্যারিবীয় সাগর এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক হামলার পরই এই নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ওয়াশিংটনের দাবি, এগুলো ছিল মূলত মাদক পাচারকারী নৌকার বিরুদ্ধে অভিযান।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: নোরিয়েগা ও সাদ্দাম প্রসঙ্গ
মাদুরোকে বন্দি করার এই ঘটনা অতীতের দুটি বড় ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসছে:
১. পানামার ম্যানুয়েল নোরিয়েগা (১৯৮৯): ১৯৮৯ সালে লাতিন আমেরিকায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মাদক পাচার, দুর্নীতি এবং গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগে পানামার সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে বন্দি করা হয়। বর্তমান মাদুরোর মতো নোরিয়েগার বিরুদ্ধেও মার্কিন আদালত আগে থেকেই মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল। নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বিচার করা হয় এবং ২০১৭ সালে তিনি পানামার কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান।
২. ইরাকের সাদ্দাম হোসেন (২০০৩): ২০০৩ সালে বিধ্বংসী গণবিধ্বংসী অস্ত্রের (WMD) মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। অভিযানের ৯ মাস পর ১৩ ডিসেম্বর তিকরিতের একটি গর্ত থেকে সাদ্দাম হোসেনকে বন্দি করে মার্কিন সেনারা। ২০০৬ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, সাদ্দাম এবং নোরিয়েগা—উভয়ই একসময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন।
হোন্ডুরাসের হার্নান্দেজ ও ট্রাম্পের ‘দ্বিমুখী’ নীতি
মাদুরোর এই সংকটের মাঝে আলোচনায় এসেছে হোন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের নাম। মাদক পাচারের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া এই নেতাকে গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সাধারণ ক্ষমা করে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে মুক্তির কয়েক দিন পরই হোন্ডুরাসের প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। বিশ্লেষকরা একে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ‘ভণ্ডামি’ বা দ্বিমুখী আচরণ হিসেবে দেখছেন।
মাদুরোর ঘটনা নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত
মাদুরোকে আটক করার দাবি সত্য হলে এটি লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক অধ্যায় যুক্ত করবে-যা শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।